গত কয়েক দশকে বিশ্বব্যাপী ডেঙ্গুর সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে, যা ২০২৪ সালে এসে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগের চিত্র ফুটে উঠেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ডেঙ্গু এখন আর কেবল গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ইউরোপ এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মতো নতুন নতুন এলাকাতেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ২০২৪ সালে ইউরোপের তিনটি দেশ—ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনেও ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে।
২০২৪ সালের রেকর্ড: বিশ্বজুড়ে ১ কোটি ৪৬ লাখেরও বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন এবং প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১২ হাজার মানুষ।
২০২৫ সালের চিত্র: জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বিশ্বের ৯৭টি দেশ থেকে ৪০ লাখের বেশি রোগী এবং ৩ হাজারেরও বেশি মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডেঙ্গুর লক্ষণ মৃদু হয় এবং ১-২ সপ্তাহের মধ্যে রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে শুরুতেই সচেতন হওয়া জরুরি। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো: উচ্চমাত্রার জ্বর (১০৪° ফারেনহাইট পর্যন্ত)তীব্র মাথাব্যথা ও চোখের পেছনে ব্যথা, মাংসপেশি ও হাড়ের সংযোগস্থলে তীব্র ব্যথা। বমি বমি ভাব ও শরীরে র্যাশ বা লালচে দাগ।
ডেঙ্গু থেকে সেরে ওঠার পরও অনেকের শরীরে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে তীব্র শারীরিক দুর্বলতা থাকতে পারে। ডেঙ্গু কিছু ক্ষেত্রে মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে, যা জীবনঝুঁকি তৈরি করে। নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে এক মুহূর্তও দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে। তীব্র পেটে ব্যথা এবং অনবরত বমি হওয়া। দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া। মাড়ি, নাক বা শরীরের অন্য কোনো স্থান দিয়ে রক্তপাত হওয়া। রক্তবমি বা পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাওয়া। প্রবল তৃষ্ণা, প্রচণ্ড দুর্বলতা এবং ত্বক ফ্যাকাশে বা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ডেঙ্গুর সুনির্দিষ্ট কোনো ওষুধ বা অ্যান্টিভাইরাল নেই। আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে করণীয়: রোগীকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে। প্রচুর পরিমাণে পানি, ওরস্যালাইন ও তরল খাবার খাওয়াতে হবে। ব্যথানাশক বা জ্বর কমানোর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কেবল ‘প্যারাসিটামল’ সেবন করা যাবে। আইবুপ্রোফেন বা অ্যাসপিরিনের মতো নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ওষুধ কোনোভাবেই সেবন করা যাবে না। এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দেয়।
ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা মূলত দিনের বেলায় বেশি কামড়ায়। তাই নিজেকে ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে নিচের পদক্ষেপগুলো নিন: শরীর ভালোভাবে ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরিধান করুন। দিনের বেলা ঘুমানোর সময়ও অবশ্যই মশারি ব্যবহার করুন। জানালার নেট ব্যবহার করুন এবং মশা তাড়ানোর স্প্রে বা কয়েল ব্যবহার করুন। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে ঘর, ছাদ ও আঙিনায় জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার রাখুন।
বর্তমানে কিছু দেশে ‘কিউডেঙ্গা’ (QDenga) নামের একটি ডেঙ্গু টিকা অনুমোদিত হলেও, এটি কেবল ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সী উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তি সচেতনতার পাশাপাশি সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি বলে তাগিদ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।