দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসন শেষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতা তারেক রহমান গতকাল ঢাকায় ফিরে এসেছেন। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে অবতরণ করেন তিনি। বিমানবন্দরে ও পরবর্তী সমাবেশে হাজার হাজার বিএনপি নেতা-কর্মী ও সমর্থক তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে দেশের মাটিতে খালি পায়ে দাঁড়ানো তারেক রহমানের এ প্রত্যাবর্তনকে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আল-জাজিরা তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন নিয়ে ‘১৭ বছর পর দেশে ফিরেছেন তারেক রহমান : বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কি তিনি?’ শিরোনামে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটি নিম্নরূপ :
তারেক রহমানের মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ অবস্থায় বিএনপির কার্যত নেতা হিসেবে তারেক রহমানই দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে তিনিই দেশের শীর্ষ ক্ষমতায় আসার অন্যতম প্রধান দাবিদার।
কে তারেক রহমান
৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র। ২০০৮ সাল থেকে তিনি যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছিলেন। মায়ের অসুস্থতার পর ২০১৮ সালে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে খালেদা জিয়ার সরকারের সময় তিনি রাজনীতিতে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিতি পান।
তবে রাজনৈতিক জীবনে তার বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ ওঠে। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরে জামিনে মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে যান। বিএনপি বরাবরই এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছে। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর তারেক রহমানের বিরুদ্ধে থাকা বেশিরভাগ মামলা ও সাজা স্থগিত বা বাতিল হয়, যার ফলে তার দেশে ফেরা সম্ভব হয়।
প্রত্যাবর্তনের তাৎপর্য
ঢাকায় ফিরে এক সমাবেশে তারেক রহমান বলেন, ‘১৯৭১ সালের মতো ২০২৪ সালেও দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছে’। তিনি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরাপদ বাংলাদেশের আহ্বান জানান, যেখানে নারী-পুরুষ-শিশু সবাই নিরাপদে বসবাস করতে পারবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নিষিদ্ধ থাকায় বিএনপির সামনে বড়সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি করে বিএনপি মধ্যপন্থী ও উদার রাজনৈতিক অবস্থান জোরদার করার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশে কর্মরত সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ মনে করেন, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতিতে ‘ধাঁধার শেষ অংশ’। তার ভাষায়, দীর্ঘ নির্বাসনের পর দেশে ফিরে তিনি যেমন দেশের পরিবর্তন কাছ থেকে দেখবেন, তেমনি জনগণও দেখবে এই সময়ে তিনি কতটা বদলেছেন।
নির্বাচনী সমীকরণ
আসন্ন নির্বাচনে বিএনপিকে এগিয়ে রাখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জরিপ সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) ডিসেম্বরের জরিপ অনুযায়ী, বিএনপির সমর্থন ৩০ শতাংশ, জামায়াতে ইসলামীর ২৬ শতাংশ এবং ছাত্রদের নেতৃত্বে গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির সমর্থন মাত্র ৬ শতাংশ। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় রাজনৈতিক মাঠে বিএনপির জন্য পরিস্থিতি অনুকূল বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। সব মিলিয়ে, ১৭ বছর পর তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল বলে ধারণা করা হচ্ছে। সূত্র : আল-জাজিরা।