শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৩৮ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
মরিশাসে ভারী কাচের বাক্স চাপায় তিন বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য বিভ্রান্তিকর ও অসত্য দাবি করে নিন্দা জামায়াতের জামায়াতকে রুখে দিতে না পারলে দেশে আরও একটি বিপর্যয় হবে: নুর আওয়ামী লীগ ও সহযোগীদের উসকানিতেই পোশাকশিল্পে অস্থিরতা: রিজভী টেকনাফের পাহাড়ে ৩ মরদেহ, উদ্ধারে যৌথবাহিনীর অভিযান অব্যাহত ৭ নভেম্বরের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান রাষ্ট্রপতির ৭ নভেম্বর ছিল বাংলাদেশের পথ নির্ণয়ের তারিখ: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বৈরাচার আওয়ামী লীগকে এ দেশে আর রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজধানীতে যাত্রীবাহী বাসে আগুন ডেঙ্গুতে আরও ৩ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১৫৩৫

‘ইউক্রেনের বাঙ্কারে প্রিয়তমকে বিয়ে, ২ দিন পরই মৃত্যু

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
  • আপডেটের সময় : রবিবার, ৯ জুন, ২০২৪
  • ৯৩ টাইম ভিউ

প্রায় আড়াই বছর ধরে ইউক্রেন-রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধ চলছে। ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বের অঞ্চলের মারিওপোল শহর এক ধ্বংসস্তূপের নগরীতে পরিণত হয়েছে। রাশিয়ার একটানা বোমাবর্ষণে এই শহরের রাস্তাঘাট ধুলায় মিশে গেছে। উঠানগুলো পরিণত হয়েছে কবরস্থানে।

কিন্তু কয়েক মিটার মাটির নিচেই একটা রোমান্সকর বাসরঘর তৈরি হয়েছিল।
২০২২ সালের বসন্তে শহরটি ঘিরে নেয় রুশ সেনারা। নিউক্লিয়ার যুদ্ধ থেকে বাঁচার জন্য সোভিয়েত আমলের তৈরি অসংখ্য বোমা শেল্টারের একটিতে অবস্থান নেন ৩৩ বছর বয়সী ভ্যালেরিয়া সুবোতিনা।

বাংকারে বিভিন্ন সেনা ও সাধারণ মানুষদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর আজভ ব্রিগেডের প্রেস অফিসার হিসেবে কাজ করছিলেন ভ্যালেরিয়া।

সেখানেই ছিলেন তার বাগদত্তা ৩৪ বছর বয়সী আন্দ্রি সুবোতিন। ইউক্রেনের এই সেনা অফিসার প্লান্টটিকে রক্ষায় লড়ছিলেন।
ইউক্রেনে রুশ অভিযান শুরু হওয়ার আগেই এই জুটির দেখা হয়েছিল। তিন বছর মারিওপোল বর্ডার গার্ড এজেন্সিতে কাজ করতে গিয়ে।

ভ্যালেরিয়াকে প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়ে যান আন্দ্রি।
ভ্যালেরিয়া বলেন, ‘আন্দ্রি ছিলেন একজন বিশেষ মানুষ, তার পাশে থাকলেই শান্তি লাগত। তিনি ছিলেন খুবই পরোপকারী। কেউ সাহায্য চাইলে কখনোই না করতেন না। যখন আমি প্রথম তাকে দেখি, তখনই বুঝে যাই আন্দ্রি অন্যদের থেকে আলাদা।

এরপর তিন মাসের ভেতর একসঙ্গে থাকতে শুরু করেন তারা। মারিওপোলে বাগানসহ একটা ছোট্ট একতলা বাড়ি করেন এবং একসঙ্গে জীবন শুরু করেন এই জুটি।

বলেন ভ্যালেরিয়া, ‘আমরা একসাথে পাহাড়ে ও বন্ধুদের সাথে ঘুরতাম। আমরা একসাথে মাছ ধরেছি, বাইরে প্রচুর সময় কাটিয়েছি। আমরা থিয়েটার কনসার্ট ও বিভিন্ন ধরনের প্রদর্শনীতে যেতাম। আমাদের জীবন ছিল সুন্দর।

তারা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে একটি গির্জায় গিয়ে বিয়ের স্বপ্ন দেখেন তারা। এমনকি বিয়ের আংটিও চূড়ান্ত করেন তারা।

চাকরি ছেড়ে নিজের সৃষ্টিশীল কাজের দিকে মনোযোগ দেন ভ্যালেরিয়া। মারিওপোলে রাশিয়ার সঙ্গে তীব্র যুদ্ধের শুরুতে কবিতা লিখে প্রকাশ করতেন।

তিনি স্মৃতিচারণা করে বলেন, রুশ আগ্রাসন শুরুর আগের কয়েক বছর ধরে আমি সত্যিই সুখী ছিলাম। কিন্তু সব কিছু বদলে যায় ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে।

২৪ ফেব্রুয়ারি পুরোমাত্রায় রুশ সামরিক অভিযান শুরুর কয়েকদিন আগে ভ্যালেরিয়াকে শহর ছেড়ে চলে যেতে বলেন আন্দ্রি। কিন্তু তিনি যেতে রাজি হন না। ভ্যালেরিয়া বলেন, ‘আমি জানতাম, যা-ই হোক না কেন, আমাকে মারিওপোলে থাকতে হবে। আমার শহর রক্ষা করতে হবে।’

কয়েক সপ্তাহ পর তাদের দুজনেরই আশ্রয় নিতে হয় আজভস্টাল বাংকারে। এরপর খুব কালেভদ্রে একে অপরকে দেখতে পেত তারা। এক পর্যায়ে মারিউপোল মানবিক বিপর্যয়ের দিকে এগোতে থাকে।

বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা হওয়ার কারণে শহরের কিছু অংশে পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তখন খাবারের সংকটও দেখা দিতে থাকে। বেসামরিক বাড়িঘর ও ভবনও ধ্বংস হয়ে যায়। ১৫ এপ্রিল একটি বড় বোমা কারখানায় ফেলা হয়। ভ্যালেরিয়া অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।

ভ্যালেরিয়া বলেন, ‘আমাকে মৃতদেহগুলোর মধ্যে পাওয়া গিয়েছিল। আমিই একমাত্র জীবিত ছিলাম। একদিকে, এটি একটি অলৌকিক ঘটনা, অন্যদিকে, এটি ছিল একটি ভয়ানক ট্র্যাজেডি।’ মাটির নিচে অবস্থিত একটি হাসপাতালের বাংকারে কয়েকবার জ্ঞান হারিয়ে প্রায় আট দিন কাটাতে হয়েছিল। সর্বত্র রক্ত ও পচা গন্ধ ছিল।

এটি ছিল একটি ভয়ংকর জায়গা। আহতরা কাটা হাত-পা নিয়ে শুয়ে ছিলেন। তারা যথাযথ চিকিৎসাও পাচ্ছিলেন না কারণ চিকিৎসা সরঞ্জামের সরবরাহ খুবই কম ছিল।

ভ্যালেরিয়ার আঘাতের পর গভীর দুশ্চিন্তায় পড়ে যান আন্দ্রি। বাংকারেই নিজেদের বিয়ের পরিকল্পনা শুরু করেন তিনি। ভ্যালেরিয়া বলেন, আন্দ্রি এত তাড়াহুড়ো করছেন যেন আমাদের হাতে আর সময় নেই।

‘তিনি নিজের হাতে টিন ফয়েল দিয়ে দুটি বিয়ের আংটি তৈরি করেন। আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। অবশ্যই, আমি হ্যাঁ বলেছিলাম। সে ছিল আমার জীবনের ভালোবাসা। আর আমাদের টিন ফয়েল দিয়ে তৈরি আংটিগুলো একেবারে নিখুঁত ছিল।’

৫ মে তাদের বিয়ে পড়ান প্লান্টে দায়িত্বরত একজন কমান্ডার। তারা বাংকারেই একটা ছোট্ট অনুষ্ঠান করেন। তাদের বিয়ের পোশাক ছিল ইউনিফর্ম।

আন্দ্রি স্ত্রীকে কথা দেন, তারা বাড়িতে ফিরে আয়োজন করে বিয়ে করবেন। যেখানে সত্যিকারের আংটি থাকবে এবং সাদা পোশাক পরবেন তিনি। কিন্তু দুই দিন পর ৭ মে রুশ বোমার আঘাতে নিহত হন আন্দ্রি। তাৎক্ষণিকভাবে তা জানতে পারেননি ভ্যালেরিয়া।

১১ মাসের রুশ বন্দিত্ব থেকে বেঁচে ফিরে এসেছেন ভ্যালেরিয়া। তার ওপর অত্যাচার ও নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। এ সময় আন্দ্রি প্রায়ই তার স্বপ্নে আসেন। তিনি একটি বন্দি বিনিময়ের অংশ হিসেবে মুক্তি পান এবং এখন ইউক্রেনে ফিরে গেছেন।

এটা এখনো বলা কঠিন, মারিওপোলে রুশ বোমা বর্ষণের ফলে ঠিক কত মানুষ মারা গেছে। কিন্তু স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বলছে, সংখ্যাটা ২০ হাজারের বেশি হবে। জাতিসংঘের হিসাবে, ৯০ শতাংশ আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এবং ধ্বংসস্তূপে এখনো মৃতদেহ রয়েছে।

ভ্যালেরিয়ার জানা মতে, তার স্বামীর মৃতদেহ এখনো দখল হওয়া শহরের আজভস্টাল স্টিল প্লান্টে রয়ে গেছে। তিনি বলেন, মাঝে মাঝে তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে তার সাথে কথা বলেন।

সূত্র : বিবিসি

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো খবর