যুক্তরাষ্ট্র অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর একটি নতুন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘গোল্ডেন ডোম’ এর নকশা চূড়ান্ত করেছে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এই ব্যবস্থা চালু করা হবে।
গত জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে হোয়াইট হাউসে ফেরার কয়েক দিনের মধ্যেই ট্রাম্প এই প্রকল্পের পরিকল্পনা উন্মোচন করেন। এই ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আসন্ন ‘পরবর্তী প্রজন্মের’ আকাশপথে হামলা মোকাবেলা করা। এর মধ্যে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে।
এই প্রকল্পের জন্য প্রাথমিকভাবে ২৫ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এটি একটি নতুন বাজেট বিলের অংশ। তবে ওয়াশিংটন ডিসি ধারণা করছে, এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ভবিষ্যতে আরও অনেক বেশি খরচ হতে পারে। সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শত্রুপক্ষের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। প্রকল্পের নেতৃত্ব দেবেন স্পেস ফোর্সের জেনারেল মাইকেল গুয়েটলাইন। বর্তমানে তিনি স্পেস ফোর্সের ভাইস চিফ অব স্পেস অপারেশনস পদে আছেন।
দ্বিতীয় মেয়াদের সপ্তম দিনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন, তারা যেন একটি পরিকল্পনা জমা দেয়। এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য হবে আকাশপথে হামলা প্রতিরোধ ও মোকাবিলা করা। হোয়াইট হাউস বলেছে, এই ধরনের হামলা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য “সবচেয়ে ভয়াবহ হুমকি” হিসেবে বিবেচিত।
হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে এক বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, এই ব্যবস্থা স্থল, জল ও মহাকাশ—তিনটি স্তরে প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা গড়ে তুলবে। এর মধ্যে মহাকাশে স্থাপিত সেন্সর ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী যন্ত্রও থাকবে। ট্রাম্প আরও জানান, কানাডা এই প্রকল্পে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছে।
এ বছরের শুরুতে ওয়াশিংটন সফরের সময় কানাডার তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী বিল ব্লেয়ার বলেন, কানাডা এই ডোম প্রকল্পে অংশ নিতে আগ্রহী। তিনি যুক্তি দেন, এটি “যুক্তিসঙ্গত” ও কানাডার “জাতীয় স্বার্থের” সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি আরও বলেন, “কানাডার জানা প্রয়োজন যে এই অঞ্চলে কী ঘটছে।” এছাড়া আর্টিক অঞ্চলসহ বিভিন্ন দিক থেকে আসা সম্ভাব্য হুমকি সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পৃথিবীর অন্য প্রান্ত থেকে বা মহাকাশ থেকে নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্রও বাধা দিতে পারবে।
‘গোল্ডেন ডোম’ আংশিকভাবে ইসরায়েলের ‘আয়রন ডোম’ থেকে অনুপ্রাণিত। ইসরায়েল ২০১১ সাল থেকে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ করছে। তবে গোল্ডেন ডোম হবে অনেক বড় ও আরও উন্নত। এটি হাইপারসনিক অস্ত্রও প্রতিহত করতে পারবে। হাইপারসনিক অস্ত্র শব্দের গতির চেয়েও দ্রুত গতিতে চলতে সক্ষম। এই ব্যবস্থায় ‘ফ্র্যাকশনাল অরবিটাল বোম্বার্ডমেন্ট সিস্টেম’ বা ফোবস নামের প্রযুক্তিও প্রতিহত করা হবে, যা মহাকাশ থেকে যুদ্ধাস্ত্র নিক্ষেপে সক্ষম।
ট্রাম্প বলেন, “এইসব ক্ষেপণাস্ত্রকে আমরা আকাশেই ধ্বংস করে দেব। সফলতার হার প্রায় ১০০ শতাংশের কাছাকাছি।”
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা আগে বলেছিলেন, গোল্ডেন ডোম এমনভাবে তৈরি করা হবে যাতে এটি বিভিন্ন স্তরে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের আগেই তা শনাক্ত করে ধ্বংস করা এবং আকাশে চলার সময় প্রতিহত করা।
এই প্রকল্পের বিভিন্ন অংশ একক একটি কেন্দ্রীয় কমান্ডের অধীনে পরিচালিত হবে বলে প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ট্রাম্প জানান, প্রাথমিকভাবে এই প্রকল্পে ২৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। সম্পূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নে খরচ হবে ১৭৫ বিলিয়ন ডলার। এই ২৫ বিলিয়ন ডলার তার ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল’-এ অন্তর্ভুক্ত, যা এখনও পাস হয়নি।
তবে কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের অনুমান অনুযায়ী, কেবল মহাকাশভিত্তিক অংশেই আগামী ২০ বছরে সরকারের ব্যয় ৫৪২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। পেন্টাগনের কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে, রাশিয়া ও চীনের তৈরি উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। ট্রাম্প বলেন, “আসলে আমাদের কোনও পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা নেই। আমাদের কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি আছে, কিন্তু কোনও সামগ্রিক ব্যবস্থা নেই। এর আগে এমন কিছু কখনোই তৈরি করা হয়নি।”
প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা (ডিআইএ) সম্প্রতি প্রকাশিত এক ব্রিফিং নথিতে বলেছে, ভবিষ্যতে ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি আরও ব্যাপক ও জটিল হয়ে উঠবে। চীন ও রাশিয়া এমন প্রযুক্তি তৈরি করছে যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ফাঁক-ফোকর খুঁজে বের করে আঘাত হানতে সক্ষম।
মঙ্গলবার ‘গোল্ডেন ডোম’ প্রকল্প সম্পর্কে নিজের পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, তিনি এই উদ্যোগের জন্য একাধিক অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো ইসরায়েলের ‘আয়রন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এই আয়রন ডোম আংশিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। ট্রাম্প আরও বলেন, তার অনুপ্রেরণার মধ্যে রয়েছেন প্রয়াত রিপাবলিকান নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান। রেগান ১৯৮০-এর দশকে ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময় হোয়াইট হাউসে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮৩ সালে রেগান তার ‘স্ট্র্যাটেজিক ডিফেন্স ইনিশিয়েটিভ’-এর অংশ হিসেবে একটি পারমাণবিক প্রতিরক্ষা ব্যারিয়ারের প্রস্তাব দেন। সেই ব্যারিয়ার মহাকাশভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পারমাণবিক হামলা প্রতিরোধের লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হতো। ট্রাম্প বলেন, “আমরা সত্যিকার অর্থেই সেই কাজটি সম্পন্ন করতে যাচ্ছি, যা প্রেসিডেন্ট রেগান ৪০ বছর আগে শুরু করেছিলেন। এর মাধ্যমে আমেরিকার ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকি চিরতরে শেষ হবে।”
তবে মহাকাশভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা, খরচ এবং এটি কি নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু করবে—এই সব বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন থেকে গেছে। ডেমোক্র্যাট সদস্যরাও এই প্রকল্পে ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। স্পেসএক্স বর্তমানে এই প্রকল্পের প্রধান প্রযুক্তি সরবরাহকারী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ডেমোক্র্যাটদের দাবি, ইলন মাস্ক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একজন বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন এবং তিনি প্রেসিডেন্টের প্রচারে বড় অঙ্কের অর্থ অনুদান দিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে তার কোম্পানির দরপত্র প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকা নিয়ে স্বার্থের সংঘাতের শঙ্কা রয়েছে।
এই বিষয়ে ডেমোক্র্যাট দলের ৪২ জন আইনপ্রণেতা যৌথভাবে একটি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তারা চিঠিতে লিখেছেন, “গোল্ডেন ডোম চুক্তির ওপর যদি ইলন মাস্ক কোনও ধরনের অন্যায্য প্রভাব খাটান, তবে এটি হবে স্বার্থের সংঘাতের নিয়ম ভঙ্গ করার আরও একটি উদাহরণ।”
মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি এই প্রশ্নের উত্তর দেননি যে কোন কোন কোম্পানি এই প্রকল্পে অংশ নেবে। বরং তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই প্রকল্প যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে শিল্পখাতকে উৎসাহিত করবে। এর মধ্যে রয়েছে আলাস্কা, ইন্ডিয়ানা, ফ্লোরিডা ও জর্জিয়া।