লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় এক নাটকীয় ও রক্তক্ষয়ী পটপরিবর্তনের পর রাজধানী কারাকাস এখন কার্যত একটি অবরুদ্ধ নগরীতে পরিণত হয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর আকস্মিক অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শহরজুড়ে কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণ জারি করা হয়েছে। রাজপথে কয়েক ডজন সামরিক চেকপোস্ট স্থাপনের পাশাপাশি সশস্ত্র টহল জোরদার করা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
কারাকাসের বর্তমান পরিস্থিতি ও নজরদারি
সর্বশেষ প্রাপ্ত সংবাদ অনুযায়ী, কারাকাসের প্রবেশপথগুলোতে কড়া পাহারা বসানো হয়েছে এবং বিদেশি সাংবাদিকদের শহরে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী নেত্রী কাতিউস্কা ক্যামারগো জানিয়েছেন, কারাকাসের অন্যতম জনবহুল এলাকা পেটারের রাস্তায় সশস্ত্র ব্যক্তিরা নিয়মিত টহল দিচ্ছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা এতটাই যে, টহলরত বাহিনীগুলো সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে তাদের স্মার্টফোনের হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাস ও মেসেজ পরীক্ষা করছে। সরকারবিরোধী কোনো তৎপরতা বা অসন্তোষের চিহ্ন পেলেই হেনস্তা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
গণমাধ্যমের ওপর দমন-পীড়ন
ভেনেজুয়েলার বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর বড় ধরনের আঘাত এসেছে। সাংবাদিক ও গণমাধ্যম কর্মীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা স্থানীয় ইউনিয়ন জানিয়েছে, সোমবার সকালে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে অন্তত ১৪ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়। যদিও দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তবে এই ঘটনা সংবাদকর্মীদের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করেছে। বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলোকে তথ্য সংগ্রহে বাধা প্রদান করায় দেশটির প্রকৃত চিত্র বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
জাতিসংঘের প্রতিক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন
এদিকে, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের এই সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর (ওএইচসিএইচআর)। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, মার্কিন এই পদক্ষেপ বিশ্বকে আরও অনিরাপদ ও অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
বিবৃতিতে ওএইচসিএইচআর জোর দিয়ে বলেছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত একযোগে এই হস্তক্ষেপের নিন্দা জানানো। জাতিসংঘের মতে, এই অভিযান আন্তর্জাতিক আইনের সেই মৌলিক নীতিকে পদদলিত করেছে, যা কোনো দেশের ভূখণ্ডের অখণ্ডতা এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে সুরক্ষা দেয়। কোনো রাষ্ট্র অন্য কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে শক্তি প্রয়োগ বা হুমকির পথ বেছে নিতে পারে না—এই সর্বজনীন নীতিটি এখানে চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে।
অভিযানের প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক পালাবদল
উল্লেখ্য, গত কয়েকদিন আগে এক ঝটিকা অভিযানের মাধ্যমে মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক-সন্ত্রাসবাদ (narco-terrorism) সহ চারটি গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগ এনেছিল। মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরপরই দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্টকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ পাঠ করানো হয়।
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই অভিযানকে ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার’ এবং ‘অপরাধ দমনের’ অংশ হিসেবে দাবি করা হলেও, বিশ্বজুড়ে এর আইনি ও নৈতিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারাকাসের রাস্তায় এখন একদিকে নতুন প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ—সব মিলিয়ে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটি।
এই সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক কূটনীতিকরা কী ভূমিকা পালন করেন, এখন সেটিই দেখার বিষয়। তবে আপাতত বুটের শব্দ আর বন্দুকের নলের নিচে চাপা পড়ে আছে ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।