ভেনেজুয়েলায় বিতর্কিত সামরিক অভিযানের রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন এক ভূ-রাজনৈতিক উত্তাপের জন্ম দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ বা আটকের পর যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী লক্ষ্য হিসেবে এখন আলোচনায় আসছে ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে যেকোনো সময় এই বিশাল দ্বীপটি দখলের পথে হাঁটতে পারে ওয়াশিংটন।
কৌশলগত ও খনিজ সম্পদের টান
ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মাঝখানে অবস্থিত গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পয়েন্ট। দীর্ঘ দিন ধরেই পেন্টাগন এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে আসছে। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসনের নজর কেবল সামরিক সুবিধাতেই সীমাবদ্ধ নয়। খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ গ্রিনল্যান্ডকে কবজায় নিতে পারলে চীন থেকে আমদানিকৃত খনিজ পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরতা অনেকটাই কমে আসবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গত ৪ জানুয়ারি (রবিবার) এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ট্রাম্প আবারও তার গ্রিনল্যান্ড নীতির পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। তিনি বলেন, “আমাদের গ্রিনল্যান্ড দরকার। এটি বর্তমানে অত্যন্ত কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। আমরা দেখছি চারদিকে রুশ ও চীনা জাহাজের আনাগোনা বাড়ছে। ডেনমার্ক একাই এই বিশাল অঞ্চল সামাল দিতে পারবে না, তাই জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এটি যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হওয়া জরুরি।”
হোয়াইট হাউজের অনড় অবস্থান
ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ইচ্ছার পাশাপাশি এটি এখন প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক অবস্থানে রূপ নিয়েছে। হোয়াইট হাউজের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার এক সাক্ষাৎকারে জানান, ট্রাম্প প্রশাসন মনে করে গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুক্ত হওয়াতেই নিহিত। সিএনএন-কে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন, “গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সামরিকভাবে লড়াই করার দুঃসাহস অন্তত কেউ দেখাবে না।”
ইউরোপে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা
ভেনেজুয়েলায় সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের পর ট্রাম্পের এমন সম্প্রসারণবাদী অবস্থানে ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন ট্রাম্পের এই মনোভাবকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ এবং ‘অসম্মানজনক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অংশকে অন্য একটি দেশ এভাবে দাবি করতে পারে না।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেনও বিষয়টিকে হালকাভাবে নিচ্ছেন না। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো ন্যাটোভুক্ত দেশের ভূখণ্ডে সামরিক হামলার বা দখলের চিন্তা করে, তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা ধসে পড়বে। এমনকি ন্যাটোর অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়বে।”
একতাবদ্ধ ইউরোপ
গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ডেনমার্কের পাশে দাঁড়িয়েছে ইউরোপের প্রভাবশালী দেশগুলো। ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড, স্পেন এবং যুক্তরাজ্য এক যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ড কেবল সেখানকার জনগণের। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য কোনো দেশের হস্তক্ষেপের অধিকার নেই।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই ‘গ্রিনল্যান্ড নীতি’ কেবল কূটনৈতিক লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে নাকি ভেনেজুয়েলার মতো বড় কোনো সামরিক সংঘাতে রূপ নেবে, তা এখন বড় প্রশ্ন। তবে ডেনমার্কের মতো ন্যাটোর ঘনিষ্ঠ মিত্রের ওপর চাপ প্রয়োগ করায় আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়ের সম্পর্কে এক নজিরবিহীন ফাটল দেখা দিয়েছে।