ইসলামাবাদের একটি হাসপাতালে গত আগস্টে আগুনে ১৪ নবজাতকের মৃত্যু শুধু একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা নয়; এটি পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার, জনসেবা এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান নিয়ে গভীর প্রশ্ন সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের কূটনৈতিক গুরুত্ব যখন বাড়ছে, তখন দেশের অভ্যন্তরে এমন একটি ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে—রাষ্ট্রের দৃশ্যমান ক্ষমতা ও সাধারণ নাগরিকের দৈনন্দিন নিরাপত্তার মধ্যে ব্যবধান কতটা বড়।
চার দশক আগে জাপান সরকারের অর্থায়নে ইসলামাবাদে যে শিশু হাসপাতালটি চালু হয়েছিল, সেখানে মূলত নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের শিশুরাই চিকিৎসা নেয়। ২৬ আগস্ট হাসপাতালের নবজাতক বিভাগে আগুন ছড়িয়ে পড়ার সময় ১৫টি শিশু ইনকিউবেটর অথবা অক্সিজেনের সহায়তায় ছিল। শেষ পর্যন্ত মাত্র একটি শিশু বেঁচে যায়।
প্রাথমিকভাবে এয়ার কন্ডিশনারের ত্রুটি থেকে আগুনের সূত্রপাতের কথা বলা হলেও পরবর্তী অভিযোগগুলো আরও উদ্বেগজনক। নিরাপত্তাকর্মীর অনুপস্থিতির কারণে নবজাতক বিভাগের দরজা বন্ধ ছিল এবং আগুন লাগার পর উদ্ধারকাজে বাধা তৈরি হয় বলে অভিযোগ ওঠে। নিহত শিশুদের স্বজনদের ক্ষোভের কেন্দ্রে ছিল শুধু আগুন নয়, বরং এমন একটি ব্যবস্থার ব্যর্থতা, যেখানে বিপদের মুহূর্তে দ্রুত উদ্ধার করার মৌলিক প্রস্তুতিও যথেষ্ট ছিল না।
আন্তর্জাতিক পরিচিতি বনাম নাগরিকের বাস্তবতা :
ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটেছে, যখন পাকিস্তান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে দৃশ্যমান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত অবসানে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেশটির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। একই সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তি হিসেবে পাকিস্তানের কৌশলগত গুরুত্বও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিনের।
কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনীতির এই পরিচয়ের পাশে রয়েছে আরেকটি পাকিস্তান—যেখানে হাসপাতালের অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা এখনো বড় ধরনের ঘাটতির মুখে। নবজাতকদের মৃত্যু সেই বৈপরীত্যকে নির্মমভাবে সামনে এনেছে।
সরকার তাৎক্ষণিকভাবে রাজধানীর স্বাস্থ্যব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা শীর্ষ আমলাকে বরখাস্ত করেছে এবং তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। তবে কোনো কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া বা তদন্ত কমিটি গঠন করাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। মূল প্রশ্ন হলো, কেন এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলার ব্যবস্থা এত দুর্বল ছিল এবং কেন সংকটের মুহূর্তে উদ্ধারকাজ কার্যকরভাবে পরিচালিত হলো না।
মানব উন্নয়নের সূচকে অবনতি
পাকিস্তানের সংকটটি কেবল একটি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জাতিসংঘের সর্বশেষ মানব উন্নয়ন সূচকেও দেশটির অবস্থানের অবনতি ঘটেছে। ২০১৬ সালে ১৪৭তম অবস্থানে থাকা পাকিস্তান চলতি বছর ১৬৮তম স্থানে নেমেছে এবং ‘নিম্ন মানব উন্নয়ন’ শ্রেণিতে রয়েছে।
এই অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার সামরিক সক্ষমতা, কূটনৈতিক প্রভাব বা বড় অবকাঠামো দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। নাগরিক কতটা নিরাপদে চিকিৎসা পায়, শিশু কতটা সুরক্ষিতভাবে জন্ম নেয়, জরুরি পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র কত দ্রুত মানুষের পাশে দাঁড়ায়—এসবও রাষ্ট্রের সক্ষমতার মৌলিক মাপকাঠি।
অর্থনীতির চাপ এই সমস্যাকে আরও জটিল করেছে। পাকিস্তানের সর্বশেষ অর্থনৈতিক জরিপ অনুযায়ী, গত অর্থবছরে দেশটি তার মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৭ শতাংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় করেছে। বিপরীতে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হয়েছে ১ শতাংশেরও কম।
এখানেই রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের প্রশ্নটি সামনে আসে। মহাসড়ক, বড় অবকাঠামো কিংবা দৃশ্যমান উন্নয়ন প্রকল্প রাজনৈতিকভাবে সহজে প্রদর্শনযোগ্য। কিন্তু হাসপাতালের নিরাপত্তাব্যবস্থা আধুনিক করা, দক্ষ অগ্নিনির্বাপণ বাহিনী গড়ে তোলা, চিকিৎসাকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া কিংবা দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা—এসবের সুফল ধীরে আসে এবং তাৎক্ষণিকভাবে রাজনৈতিক প্রচারের উপযোগী নাও হতে পারে। অথচ মানুষের জীবনের সঙ্গে এসবের সম্পর্ক সরাসরি।