ইউক্রেন যুদ্ধ ২০২৫ সালে এক নতুন মোড় নিয়েছে। বছরের শেষ প্রান্তে এসে রাশিয়ার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তারা ইউক্রেনের একটি বিশাল অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়েছে। তবে ক্রেমলিনের এই দাবি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে, বিশেষ করে যুদ্ধ পর্যবেক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক ও সংশয় তৈরি হয়েছে।
রুশ ভূখণ্ড দখলের দাবি ও পুতিনের বক্তব্য
বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, চলতি ২০২৫ সালে ইউক্রেনের ৫,১০০ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি এলাকা দখল করার দাবি করেছে মস্কো। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সরাসরি ঘোষণা করেছেন যে, তার বাহিনী ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দোনেৎস্কের কৌশলগত শহর সিভারস্ক এবং উত্তরের খারকিভ অঞ্চলের ভোভচানস্ক শহর পুরোপুরি দখল করেছে।
পুতিন আরও দাবি করেন, দোনেৎস্কের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা লিমান ও কোস্তিয়ান্তিনিভকার প্রায় অর্ধেক এখন রুশ সেনাদের অধীনে। এছাড়া দক্ষিণাঞ্চলীয় জাপোরিঝিয়া অঞ্চলের হুলিয়াইপোল শহরের নিয়ন্ত্রণও রাশিয়ার হাতে এসেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। রুশ সামরিক নেতৃত্বের দাবি অনুযায়ী, এই অগ্রযাত্রা তাদের বিশেষ সামরিক অভিযানের বড় সাফল্য।
পর্যবেক্ষকদের ভিন্ন চিত্র: পরিসংখ্যানের লড়াই
পুতিনের এই দাবিকে নাকচ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার’ (আইএসডব্লিউ)। সংস্থাটি বলছে, স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত চিত্র এবং যুদ্ধক্ষেত্রের উন্মুক্ত তথ্যের (Open Source) সাথে পুতিনের দাবির কোনো মিল নেই। আইএসডব্লিউ-এর তথ্যমতে, হুলিয়াইপোলে রুশ বাহিনীর উপস্থিতি মাত্র ৭.৩ শতাংশ, যা মূলত সম্মুখ যুদ্ধের অংশ হিসেবে অস্থায়ী অবস্থান। একইভাবে লিমান শহরে মাত্র ২.৯ শতাংশ এলাকায় রুশ সেনাদের গতিবিধি লক্ষ্য করা গেছে। কোস্তিয়ান্তিনিভকায় রাশিয়ার অগ্রগতি ৫ শতাংশের বেশি নয় বলে সংস্থাটি নিশ্চিত করেছে।
রুশ ব্লুগারদের দ্বিমত ও অভ্যন্তরীণ অসংগতি
আশ্চর্যের বিষয় হলো, খোদ রাশিয়ার কট্টরপন্থী সামরিক ব্লগাররাও পুতিনের সব দাবির সাথে একমত হতে পারছেন না। আইএসডব্লিউ-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এসব রুশপন্থী ব্লগারদের তথ্যমতেই লিমানের মাত্র ৭ শতাংশ এবং কোস্তিয়ান্তিনিভকার প্রায় ১১ শতাংশ এলাকা রুশ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অর্থাৎ, ক্রেমলিন যে বিশাল বিজয়ের কথা বলছে, রাশিয়ার ভেতরের তথ্যের সাথেই তার বড় ধরনের অমিল রয়েছে।
শুধু তাই নয়, রাশিয়ার সামরিক কর্মকর্তাদের নিজেদের তথ্যেও অসংগতি দেখা গেছে। গত ১৮ ডিসেম্বর সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ভ্যালেরি গেরাসিমভ জানান, চলতি বছরে তারা ৬,৩০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করেছেন। অথচ এর মাত্র এক সপ্তাহ আগে প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রেই বেলাউসভ এই সংখ্যাটি ৬,০০০ বলে উল্লেখ করেছিলেন। কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যের এই ৩শ বর্গকিলোমিটারের তফাত রাশিয়ার দাবির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
বাস্তব চিত্র ও ইউক্রেনীয় প্রতিরোধ
এর আগে ক্রেমলিন দাবি করেছিল যে তারা খারকিভের কুপিয়ানস্ক এবং দোনেৎস্কের গুরুত্বপূর্ণ শহর পোকরভস্ক দখল করে নিয়েছে। তবে আইএসডব্লিউ-এর হিসাব বলছে, খারকিভ অঞ্চলের মাত্র ৭.২ শতাংশ এলাকায় রুশ সেনাদের আনাগোনা রয়েছে। অন্যদিকে, ইউক্রেনের সেনাপ্রধানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পোকরভস্কের হারানো ভূখণ্ডের মধ্যে অন্তত ১৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা ইউক্রেনীয় বাহিনী পাল্টা আক্রমণের মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।
আইএসডব্লিউ-এর চূড়ান্ত হিসাব মতে, ২০২৫ সালে রাশিয়া সর্বোচ্চ ৪,৯৮৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা এবং ১৯৬টি বসতি দখল করতে পেরেছে। এটি রাশিয়ার দাবি করা ৩শ বসতির চেয়ে অনেক কম। যুদ্ধের ময়দানে প্রচারণার লড়াই বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তবে উপগ্রহ চিত্র এবং নিরপেক্ষ তথ্য বলছে, রাশিয়ার বিজয়ের দাবি যতটা বিশাল, বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও সীমিত। ইউক্রেনীয় বাহিনীর প্রতিরোধ এবং কৌশলগত পাল্টা আক্রমণ রাশিয়ার এই অগ্রযাত্রাকে এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে রেখেছে।