আগামী জানুয়ারির অধিবেশনেই জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধনের বিল আনা হবে বলে জানিয়েছেন এ সংক্রান্ত কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বলেছেন, প্রস্তাবনায় পরিবর্তন আসায় সংশোধনী পাস হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে আয়োজন করা হবে গণভোটের।রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের ক্যাবিনেট কক্ষে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক এবং সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে সংবিধান সংশোধন বিষয়ে মতামত গ্রহণ করে এ সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি। সেখানেই এ তথ্য জানান তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিরোধী দলকে আলোচনায় অংশ নেয়ার আহ্বানও জানানো হয়েছে। বিভেদ নয়, জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতেই সংবিধান সংশোধনের কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।’
এসময় সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন এলে গণভোটের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলেও অবহিত করেন তিনি।
উল্লেখ্য, গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের ‘সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ গঠন করা হয়। কমিটিতে বিরোধী দল থেকে পাঁচ প্রতিনিধি চাওয়া হলেও তারা নাম দেয়নি। ওই কমিটিও প্রত্যাখ্যান করে বিরোধী দল।
বিলের সময়সীমা ও প্রক্রিয়া
ডিসেম্বর ২০২৬: সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপনের জোর চেষ্টা চলছে। জানুয়ারি ২০২৭: এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত বিলটি তৈরি করবে এবং বছরের প্রথম সংসদ অধিবেশনে তা উত্থাপন করা হবে।
গণভোটের বাধ্যবাধকতা: প্রস্তাবনা (Preamble), অনুচ্ছেদ ৮ (মূলনীতি), অনুচ্ছেদ ৪৮, ৫ এবং ১৪২ সহ মৌলিক বিধানগুলোতে পরিবর্তন এলে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে তা গণভোটে পাঠানো হবে।
সম্ভাব্য প্রধান পরিবর্তনসমূহ
আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস: সংবিধানের প্রস্তাবনা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে (অনুচ্ছেদ ৮) ‘মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব রয়েছে।
জুলাই জাতীয় সনদ: ‘জুলাই সনদ’ শতভাগ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে এই সংশোধনী এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা: ভবিষ্যতে যেন কেউ এই ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে না পারে, সেজন্য কেয়ারটেকার গভর্নমেন্ট বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সুরক্ষায় গণভোটের বাধ্যবাধকতায় যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।
সংবিধানে গণভোটের বিধান পুনর্বহাল (প্রথম ধাপ)
আইনি জটিলতা: ১৯৭৫ সালের পর সংবিধানে গণভোটের বিধান যুক্ত করা হয়েছিল (১৪২ অনুচ্ছেদের ১এ দফা), কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীর (২০১১) মাধ্যমে তা বাতিল করা হয়।
সমাধান: গণভোট আয়োজন করতে হলে ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাসের সংসদ অধিবেশনে প্রথমে ১৪২ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে গণভোটের আইনি ও সাংবিধানিক বিধানটি পুনর্প্রবর্তন করতে হবে। এটি সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে পাস হতে হবে।
গণভোটের আওতাভুক্ত বিষয়সমূহ
বিশেষ কমিটির প্রস্তাব অনুযায়ী, সংবিধানে এমন কিছু “লক-ইন” (Lock-in) বা অতি-গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ নির্ধারণ করা হবে, যা শুধু সংসদ সদস্যরা চাইলেই পরিবর্তন করতে পারবেন না। এগুলোর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য জনগণের সরাসরি ভোট লাগবে। যেমন: প্রস্তাবনা ও মূলনীতি: সংবিধানের প্রস্তাবনা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি (অনুচ্ছেদ ৮)। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা: ভবিষ্যতে কেয়ারটেকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যেন কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বাতিল করতে না পারে, সেজন্য এটিকে গণভোটের আওতাভুক্ত করা হবে।
ভোটের আইনি প্রক্রিয়া ও সময়সীমা
সংসদে বিল পাস হওয়ার পর এটি সরাসরি রাষ্ট্রপতির কাছে না গিয়ে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে জনগণের কাছে যাবে:রাষ্ট্রপতির রেফারেন্স: সংসদ কোনো মৌলিক সংশোধনী পাস করার পর রাষ্ট্রপতি তা জনগণের সম্মতির জন্য (গণভোটে) পাঠাবেন।
নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব: নির্বাচন কমিশন (EC) নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (সাধারণত ৯০ দিনের মধ্যে) সারা দেশে ব্যালটের মাধ্যমে হ্যাঁ/না ভোটের আয়োজন করবে।
চূড়ান্ত অনুমোদন: দেশের মোট ভোটারের একটি নির্দিষ্ট অংশ (যেমন ৫০% এর বেশি) যদি প্রস্তাবের পক্ষে “হ্যাঁ” ভোট দেয়, তবেই বিলটি অনুমোদিত হবে এবং রাষ্ট্রপতি তাতে স্বাক্ষর করবেন। জনগণ “না” ভোট দিলে সংসদ থেকে পাস হওয়া বিলটি বাতিল হয়ে যাবে।