নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধ এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে প্রশাসনের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বক্তারা। তারা বলেছেন, শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এ ধরনের সামাজিক সমস্যা পুরোপুরি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এর জন্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, অভিভাবক, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতা এবং সাধারণ জনগণকে একযোগে কাজ করতে হবে।
সোমবার (১৭ আগস্ট) সকাল ১০টায় ঢাকার লালমাটিয়ায় মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালকের কার্যালয়ে ‘নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধ এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে করণীয়’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, ঢাকা জেলার উপপরিচালকের সভাপতিত্বে আয়োজিত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকার জেলা প্রশাসক মিজ ফরিদা খানম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ঢাকার উপপরিচালক।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম বলেন, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। বাল্যবিবাহ বা নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনকে জানানো গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
এ সময় তিনি নাগরিকদের অভিযোগ ও সমস্যা প্রশাসনের কাছে সহজে পৌঁছে দেওয়ার জন্য চালু হওয়া ‘হ্যালো ডিসি’ অ্যাপের কথাও উল্লেখ করেন। অ্যাপটির মাধ্যমে নাগরিকরা বিভিন্ন অভিযোগ, আবেদন ও তথ্য সরাসরি জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠাতে পারেন এবং সেবার অগ্রগতিও পর্যবেক্ষণ করা যায়।
সভায় মুক্ত আলোচনায় বাল্যবিবাহ ও নারী-শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে বিভিন্ন বাস্তবসম্মত উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন অংশগ্রহণকারীরা।
ভুয়া জন্মনিবন্ধন প্রতিরোধের দাবি
ঢাকা আহছানিয়া মিশনের প্রতিনিধি বলেন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সঠিক ও নির্ভুল জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া জন্মসনদ তৈরি করে বয়স পরিবর্তন করে বিয়ের আয়োজন করা হয়। তাই জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি তথ্যের যথার্থতা যাচাই এবং জালিয়াতি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
তৃণমূল পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান
স্বেচ্ছাসেবী মহিলা সমিতির প্রতিনিধিরা বলেন, বাল্যবিবাহ ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে পরিবার ও স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি এবং কোনো অনিয়মের তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসন ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দেন তারা।
সমাপনী বক্তব্যে ঢাকা জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক বলেন, আইন মানুষের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্যই তৈরি হয়েছে। ধর্মের দোহাই দিয়ে বাল্যবিবাহকে উৎসাহিত করার কোনো সুযোগ নেই। ধর্মীয় মূল্যবোধের সঠিক ব্যাখ্যার পাশাপাশি প্রচলিত আইন মেনে চলাও জরুরি।
তিনি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ কোনো একক দপ্তর বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, শিক্ষক, অভিভাবক, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতা এবং সাধারণ জনগণকে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
সভায় বক্তারা আরও বলেন, বাল্যবিবাহ বন্ধে শুধু বিয়ের আয়োজনের সময় ব্যবস্থা নিলে হবে না; পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় পর্যায়ে আগে থেকেই সচেতনতা ও নজরদারি জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার অভিযোগ দ্রুত গ্রহণ, যাচাই ও প্রয়োজনীয় আইনগত সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সভায় সরকারি কর্মকর্তা, বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) প্রতিনিধি, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী মহিলা সমিতির সভানেত্রী ও প্রতিনিধি, নারী ও শিশু বিষয়ক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অংশীজনরা অংশ নেন।
বক্তারা মনে করেন, প্রশাসনিক তৎপরতার সঙ্গে সামাজিক প্রতিরোধ ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা গেলে বাল্যবিবাহ এবং নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।