শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:৩৫ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
যুদ্ধ বন্ধের চাপ বাড়ছে, মরিয়া ট্রাম্প এখন ইরানে হামলা চালালে ঘটতে পারে ভয়াবহ বিপর্যয় শিশুদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী ভুটানকে হারিয়ে সাফে শুভসূচনা বাংলাদেশের চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডোর নিয়ে সরকার ইতিবাচক: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী টেকনাফে মানবপাচারকারীদের সঙ্গে যৌথ বাহিনীর গোলাগুলি, সেনাসদস্য আহত ঢাকা-পাবনা রুটে নতুন দুই আন্তঃনগর ট্রেন, উদ্বোধন ১৯ নভেম্বর আইইইএফএর প্রতিবেদন : এলএনজিতে বাড়ছে ভর্তুকির চাপ, বিনিয়োগ ঝুঁকিতে বাংলাদেশ এনসিপি থেকে পদত্যাগ করলেন সামান্তা শারমিন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে বাংলাদেশে হারিয়ে যাবে পর্বতারোহণ: শাকিল একনেকে ৫৮ হাজার ৮৮ কোটি টাকার ১৩ প্রকল্প অনুমোদন

‘আই লাভ মুহাম্মদ’ বলায় মুসলিমদের ওপর দমনপীড়ন চলছে ভারতে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
  • আপডেটের সময় : মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৭৫ টাইম ভিউ

ভারতের উত্তর প্রদেশের শিল্পনগরী কানপুরের মুসলিম অধ্যুষিত সাঈদ নগরে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মদিন উপলক্ষে টাঙানো ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ লেখা একটি আলোকিত সাইনবোর্ডকে কেন্দ্র করে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ধরপাকড় ও নিপীড়ন শুরু হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর অভিযোগে ওই এলাকার একাধিক মুসলিম বাসিন্দার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে, তাদের মধ্যে কয়েকজনকে বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদও করা হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটে ৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায়। সাঈদ নগরের শ্রমজীবী মুসলিমরা ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে সাজসজ্জার অংশ হিসেবে একটি সাইনবোর্ড টাঙান, যাতে লেখা ছিল—‘আই লাভ মুহাম্মদ’, সঙ্গে ছিল একটি লাল রঙের হার্ট চিহ্ন। দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সম্প্রদায়ের মতো তারাও কোরআন তেলাওয়াত, ধর্মীয় সমাবেশ ও নবীর জীবনের ওপর আলোচনার মাধ্যমে দিনটি উদ্‌যাপন করছিলেন। তবে ভারতের কানপুরে এর আগে এ ধরনের সাইনবোর্ড টাঙানোর নজির ছিল না।

সাইনবোর্ডে আলো জ্বলে ওঠার পরপরই কয়েকজন হিন্দু ব্যক্তি সেখানে গিয়ে আপত্তি তোলেন এবং পুলিশকে খবর দেন। রাতেই কয়েক ঘণ্টা বিশৃঙ্খলার পর পুলিশ সাইনবোর্ডটি সরিয়ে ফেলে। এরপর ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টি ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে নয়জন মুসলিম পুরুষ ও অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। যদিও এখন পর্যন্ত কেউ গ্রেফতার হয়নি।

স্থানীয় হিন্দু গোষ্ঠী ‘শ্রী রামনবমী সমিতি’র সদস্য মোহিত বাজপায়ী বলেন, “আমাদের ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ লেখায় আপত্তি নেই, কিন্তু এটি যে স্থানে টাঙানো হয়েছিল, সেটি নিয়ে আপত্তি আছে। কারণ ওই জায়গাটি সাধারণত হিন্দুদের উৎসবের জন্য ব্যবহৃত হয়।” তিনি আরও বলেন, “সংবিধানে সব ধর্মের সমান অধিকার রয়েছে। তবে নতুন জায়গায় নতুন প্রথা চালু করা উচিত নয়।”

অন্যদিকে সাঈদ নগরের মুসলিম বাসিন্দারা জানান, সাইনবোর্ডটি এমন এক উন্মুক্ত স্থানে টাঙানো হয়েছিল, যেখানে প্রতিবছর তারা ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদ্‌যাপন করেন। ২৮ বছর বয়সী এক মুসলিম তরুণ বলেন, “সাজসজ্জার জন্য আমাদের কাছে সরকারি অনুমতি ছিল। সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেকের ধর্ম পালনের অধিকার আছে।” তবে সরকারি দমন-পীড়নের আশঙ্কায় তিনি নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি। তার বিরুদ্ধেও মামলা করা হয়েছে।

কানপুরের অভিযুক্তদের আইনজীবী এম এ খান জানান, মুসলিমদের বিরুদ্ধে ৫ সেপ্টেম্বর ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আয়োজিত শোভাযাত্রার সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি ব্যানার ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ আনা হয়েছে। অথচ যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তাদের অনেকেই ওই শোভাযাত্রায় ছিলেন না।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে আঘাত ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

উত্তর প্রদেশে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মুসলিমের বসবাস, যা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ এবং সৌদি আরবের জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। ২০১৭ সাল থেকে প্রদেশটি শাসন করছেন উগ্র হিন্দুত্ববাদী নেতা যোগী আদিত্যনাথ, যিনি নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপির একজন প্রভাবশালী মুখ। মুসলিমবিরোধী বক্তব্য ও নীতির জন্য তিনি কুখ্যাত।

কানপুরের ঘটনার পরই এর প্রভাব পড়ে রাজ্যের আরেক শহর বেরেলিতে, যা প্রায় ২৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং বেরলভি সুন্নি মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বিশ্বজুড়ে এ সম্প্রদায়ের অনুসারীর সংখ্যা ২০ থেকে ৩০ কোটি।

গত ১০ সেপ্টেম্বর রাজ্য পুলিশ বেরেলিতে একজন ধর্মীয় নেতাসহ নয়জন মুসলিমের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করে। অভিযোগ করা হয়, তারা ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট ও নতুন প্রথা চালু করে জনশৃঙ্খলা হুমকির মুখে ফেলেছেন।

প্রতিবাদ ও প্রশাসনের বাধা

বেরলভি সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আহমেদ রেজা খানের উত্তরসূরি ও মুসলিম সংগঠন ইত্তেহাদ-ই-মিল্লাত কাউন্সিলের (আইএমসি) প্রধান মাওলানা তৌকির রেজা খান ২১ সেপ্টেম্বর কানপুর ও বেরেলিতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভের ডাক দেন। তিনি ২৬ সেপ্টেম্বর শুক্রবার জুমার নামাজের পর একটি মাঠে সমাবেশ করার আহ্বান জানান।

তবে স্থানীয় প্রশাসন সমাবেশের অনুমতি দেয়নি। পরদিন ২৫ সেপ্টেম্বর আইএমসি একটি বিবৃতি প্রকাশ করে মানুষকে বিক্ষোভে অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানায়। কিন্তু কিছু সময় পর তৌকির রেজা খানের সমর্থকেরা সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেন, আইএমসির বিবৃতিটি ভুয়া এবং সংগঠনকে কলঙ্কিত করার উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হয়েছে।

২৬ সেপ্টেম্বর জুমার নামাজের পর হাজার হাজার মুসলিম বেরেলির একটি বিখ্যাত মাজারের আশপাশে জড়ো হন। তাদের হাতে ছিল ‘আই লাভ মুহাম্মদ (সা.)’ লেখা পোস্টার। এ সময় তারা কানপুরে মুসলিমদের বিরুদ্ধে পুলিশের ভূমিকার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে স্লোগান দেন। ভারতে সাম্প্রতিক এ ঘটনাগুলো মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর ক্রমবর্ধমান হস্তক্ষেপ ও উগ্র হিন্দুত্ববাদের প্রভাব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো খবর