চলতি বছর রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ফরাসি ও জাপানের দুই বিজ্ঞানী। তারা হলেন ফরাসি রসায়নবিদ হেনরি কাগন এবং জাপানি রসায়নবিদ কেনসো সোয়াই। বুধবার (৭ অক্টোবর) বাংলাদেশ সময় বিকেল পৌনে ৪টার দিকে রসায়নে নোবেলজয়ী এই দুই বিজ্ঞানীর নাম ঘোষণা করা হয়। রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্স জানিয়েছে, জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অরৈখিক প্রভাব এবং অসমমিত সংশ্লেষণে স্বয়ংক্রিয় অনুঘটন প্রক্রিয়া আবিষ্কারের জন্য হেনরি কাগন ও কেনসো সোয়াইকে এ বছরের রসায়নে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
অ্যামিনো অ্যাসিডের মতো কিছু অণু দুটি ভিন্ন রূপে থাকে, যেগুলো একে অপরের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু জীবদেহে সাধারণত এর একটি প্রতিচ্ছবিই থাকে। এ ধরনের রাসায়নিক অসামঞ্জস্যতা কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘদিন ধরে রসায়নবিদদের কাছে রহস্য ছিল। এই রহস্য উন্মোচনের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্যই এ বছর দুই বিজ্ঞানীকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
জীবনের রসায়নে এ বৈশিষ্ট্যকে রসায়নবিদরা ‘হোমোকাইরাল’ বলে থাকেন। শব্দটি এসেছে গ্রিক ‘একই’ ও ‘হাত’ শব্দ থেকে। হাতের মতো অ্যামিনো অ্যাসিডও দুটি আয়না-রূপে থাকে। তবে এর মধ্যে কেবল একটি রূপই কোষের প্রোটিনে পাওয়া যায়। অন্য রূপটি প্রকৃতিতে খুব একটা দেখা যায় না।
হোমোকাইরাল কীভাবে তৈরি হতে পারে, তা নিয়ে রসায়নবিদরা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করেছেন। এমন রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ে পরীক্ষা চালালে, যাতে দুটি আয়না-অণু তৈরি হতে পারে, টেস্টটিউবে সাধারণত দুই রূপই সমান পরিমাণে পাওয়া যেত। কিন্তু রসায়নবিদরা একটি নির্দিষ্ট আয়না-রূপ তৈরি করতে চেয়েছেন। কারণ জীবন্ত প্রাণীর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করবে এমন অণু তৈরির ক্ষেত্রে, যেমন ওষুধ তৈরিতে, নির্দিষ্ট একটি প্রতিচ্ছবিই কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়।
২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার এমন আবিষ্কারকে স্বীকৃতি দিয়েছে, যা রসায়নবিদদের হোমোকাইরাল রূপ তৈরি করে এমন রাসায়নিক বিক্রিয়া পরিচালনা করতে সক্ষম করেছে।
এক্ষেত্রে ১৯৮৬ সালে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন হেনরি কাগন। তিনি রাসায়নিকের প্রতিক্রিয়া পরিবর্তনের একটি নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এর মাধ্যমে একটি প্রতিচ্ছবির ওপর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন তিনি, যা এর আগে সম্ভব বলে ধারণা করা হতো না।
অন্যদিকে কেনসো সোয়াই ১৯৯৫ সালে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন। একটি জার্নালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তিনি প্রথমবারের মতো এমন একটি রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া নকশার কথা জানান, যা সম্ভাব্য হোমোকাইরাল ছিল। ২০০৩ সালে তিনি এতে চূড়ান্ত সাফল্য পান। তিনি এমন একটি প্রতিক্রিয়া দেখান, যেখানে সম্ভাব্য একটি প্রতিচ্ছবি তৈরি হয়েছিল। জীব ছাড়া এর আগে কেউ এমন সাফল্য পাননি।
এর আগে গত বছর রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন তিন বিজ্ঞানী। তারা হলেন সুসুমু কিতাগাওয়া, রিচার্ড রবসন ও ওমর এম ইয়াগি। ‘মেটাল অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক’ উদ্ভাবনের কারণে তাদের রসায়নে নোবেল দেওয়া হয় বলে জানায় সুইডিশ অ্যাকাডেমি।
এখন পর্যন্ত রসায়নে ১১৭ বার নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এ বিভাগে সবচেয়ে বেশি বয়সে নোবেলজয়ী ব্যক্তি হিসেবে ২০১৮ সালে ৯৭ বছর বয়সে পুরস্কার পান জন বি গুডএনাফ। অপরদিকে ১৯৩৫ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে এ সম্মানজনক পুরস্কার পান ফ্রেডেরিক জোলিয়ট। সব মিলিয়ে ১৯৮ জন রসায়নশাস্ত্রে সর্বোচ্চ মর্যাদার এ পুরস্কার পেয়েছেন।
১৯০১ সাল থেকে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার নোবেল দেওয়া হচ্ছে। সুইডিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের নামে এ পুরস্কারের নামকরণ করা হয়েছে। ঊনবিংশ শতকের এই বিজ্ঞানী শক্তিশালী বিস্ফোরক ডিনামাইট আবিষ্কার করে বিপুল অর্থের মালিক হয়েছিলেন। তিনি উইল করে গিয়েছিলেন, তার রেখে যাওয়া অর্থ থেকে প্রতিবছর পদার্থ, রসায়ন, চিকিৎসা, শান্তি ও সাহিত্যে বিশেষ অবদান রাখা ব্যক্তিদের পুরস্কৃত করা হবে। পরবর্তীতে ১৯৬৯ সাল থেকে এই পাঁচ বিভাগের সঙ্গে অর্থনীতিও যুক্ত হয়।