নবপ্রতিষ্ঠিত শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শকৃবি) প্রথম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. হোসেন উদ্দিন শেখর। রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলরের অনুমোদনক্রমে গত ৮ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০২৩ (সংশোধিত-২০২৫)-এর ৯(১) ধারা অনুযায়ী তাঁকে উপাচার্য পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁর মেয়াদ হবে যোগদানের তারিখ থেকে চার বছর অথবা অবসর গ্রহণের তারিখ পর্যন্ত যেটি আগে ঘটে। দায়িত্ব পালনকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নিজ পদ বহাল থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে তাঁকে সার্বক্ষণিকভাবে ক্যাম্পাসে অবস্থান করতে হবে।
অধ্যাপক হোসেন উদ্দিন শেখর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগ থেকে ১৯৮৬ সালে স্নাতক এবং ১৯৮৭ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে জাপানের টোকিও মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি থেকে ২০০৩ সালে বায়োকেমিস্ট্রি ও মলিকুলার বায়োলজিতে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রোফাইলেও তাঁর শিক্ষাজীবনের এসব তথ্য উল্লেখ রয়েছে।
জাপানে গবেষণার সময় তিনি নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী অধ্যাপক ইয়োশিনোরি ওসুমির সঙ্গে যৌথ গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। ২০০৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে হোসেন উদ্দিন শেখরের নাম ওসুমিসহ গবেষক দলের সদস্য হিসেবে রয়েছে।
পিএইচডির পর জাপানে পোস্টডক্টরাল গবেষণার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর গবেষণার ক্ষেত্রের মধ্যে পুষ্টিবিজ্ঞান, ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্ট্রি ও ফাংশনাল ফুডসহ জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় রয়েছে।
অধ্যাপক শেখর ১৯৯২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরে সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক এবং ২০০৭ সালে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন।
এর আগে তিনি গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ উপাচার্য হিসেবে ৩০ অক্টোবর ২০২৪ থেকে ১৯ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ বিভাগে ফিরে যান। শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হিসেবে নতুন দায়িত্ব নেওয়ার মাধ্যমে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অভিজ্ঞতায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত হলো।
গবেষণাক্ষেত্রে অধ্যাপক শেখরের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে তাঁর ১১০টির বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক বিশেষ সম্মাননা পাওয়া ৬২ জন গবেষকের মধ্যেও তিনি ছিলেন।
ফাংশনাল ফুড ও পুষ্টিবিষয়ক গবেষণায় তাঁর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। তাঁর রচিত ইংরেজি বই ‘Functional Foods From Bangladesh’ ২০১২ সালে প্রকাশিত হয়। এছাড়া ‘Biotechnological Advances in Healthomics’ বইটির তিনি যৌথ সম্পাদকদের একজন; বইটি স্প্রিঞ্জার থেকে প্রকাশিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও প্রকাশনা তথ্যেও তাঁর বিভিন্ন বই, বইয়ের অধ্যায় এবং আন্তর্জাতিক প্রকাশনার তথ্য পাওয়া যায়।
গবেষণার পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা ও আন্তর্জাতিক একাডেমিক কার্যক্রমেও যুক্ত রয়েছেন অধ্যাপক শেখর। তিনি Bioresources Communications-এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে PLOS ONE, Frontiers in Molecular Biosciences, BioMed Research International এবং Springer-এর Discover Toxicology-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালের সম্পাদকীয় কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
এ ছাড়া জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা FAO-এর Global Forum on Food Security and Nutrition-এর সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। বর্তমানে তিনি Voluntary Consumers Training and Awareness Society (VOCU)-এর সভাপতি এবং Bangladesh Society for Biochemistry and Molecular Biology-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর অধ্যাপক ড. হোসেন উদ্দিন শেখরের নিয়োগের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্ববিদ্যালয়টি পূর্ণাঙ্গ উপাচার্য পেল। এখন একাডেমিক কাঠামো গড়ে তোলা, প্রশাসনিক কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া, শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ তৈরি এবং কৃষিভিত্তিক উচ্চশিক্ষাকে এগিয়ে নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তাঁর ওপর পড়েছে।
গবেষণা, শিক্ষকতা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও গবেষণা কার্যক্রমকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে। তাঁর নিয়োগের মধ্য দিয়ে শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হলো।