রাজধানীর মগবাজার এলাকায় ফ্লাইওভারের ওপর থেকে বোমা নিক্ষেপের এক ভয়াবহ ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন সিয়াম (২০) নামের এক তরুণ। বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) দিবাগত রাতে মগবাজারের মুক্তিযোদ্ধা গলির সামনে এই মর্মান্তিক ও নৃশংস ঘটনাটি ঘটে। জনবহুল এলাকায় এমন অতর্কিত হামলায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
ঘটনার বিবরণ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য:
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার রাতে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে যানবাহন চলাচলের সময় হঠাৎ করেই নিচের দিকে একটি শক্তিশালী হাতবোমা নিক্ষেপ করা হয়। সেই সময় নিচে মুক্তিযোদ্ধা গলির মুখে দাঁড়িয়ে চা পান করছিলেন সিয়াম। ওপর থেকে আসা বোমাটি সরাসরি তার মাথার ওপর পড়ে এবং বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণের তীব্রতায় সিয়ামের মাথা ও শরীরের ওপরের অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু ঘটে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত একজন প্রত্যক্ষদর্শী আতঙ্কিত কণ্ঠে বলেন, “সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। হঠাৎ বিকট শব্দে কানে তালা লেগে যায়। তাকিয়ে দেখি ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মধ্যে এক যুবক রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ফ্লাইওভারের ওপর থেকে বোমাটি ফেলা হয়েছে বলে আমরা নিশ্চিত।”
পরিবারের আহাজারি:
নিহত সিয়ামের গ্রামের বাড়ি থেকে আসা সংবাদে জানা গেছে, তিনি স্থানীয় একটি মোটরপার্টসের দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন। তার বাবা কান্নাজড়িত কণ্ঠে গণমাধ্যমকে বলেন, “আমার ছেলেটা সারাদিন দোকানে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে বাসায় ফিরছিল। পথে একটু চা খেতে দাঁড়িয়েছিল, আর তখনই ওপর থেকে যমদূত নেমে এল। ও তো কোনো রাজনীতি করত না, কারোর ক্ষতি করেনি। কেন আমার ছেলেকে এভাবে মরতে হলো?”
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা:
ঘটনার পরপরই হাতিরঝিল ও রমনা থানা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। পুরো এলাকাটি ক্রাইম সিন ফিতা দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়। খবর পেয়ে পুলিশের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের একটি বিশেষ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিস্ফোরকের আলামত ও স্প্লিন্টার সংগ্রহ করে।
রমনা জোনের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. মাসুদ আলম ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, “প্রাথমিক তদন্তে বোঝা যাচ্ছে এটি একটি সুপরিকল্পিত নাশকতা। ফ্লাইওভারের ওপর থেকে অত্যন্ত সুক্ষ্ম লক্ষ্যবস্তু করে বোমাটি নিচে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, যা সরাসরি ভিকটিমের মাথায় আঘাত করে। আমরা সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করছি এবং কারা এই অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে তাদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।”
হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. গোলাম মুর্তজা জানান, বোমা নিক্ষেপের খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশ পাঠানো হয়েছে। অপরাধীদের ধরতে রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে তল্লাশি চৌকি বসানো হয়েছে এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
নাশকতার আশঙ্কা ও নিরাপত্তা শঙ্কা:
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যেই এই ধরনের চোরাগোপ্তা হামলা চালানো হয়েছে। ফ্লাইওভারের মতো উঁচু স্থান থেকে ব্যস্ততম সড়কে বোমা নিক্ষেপের ঘটনাটি জননিরাপত্তার জন্য এক নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। সাধারণ মানুষ এখন ফ্লাইওভারের নিচে চলাফেরা করতেও আতঙ্কবোধ করছেন।
নিহত সিয়ামের মরদেহ বর্তমানে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। এই ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এই ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি, তবে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।