চীনের প্রায় ৩০টি কোম্পানি বাংলাদেশে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলে (সিইআইজেড) প্রায় ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। এই বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্থানীয় জনগণের জন্য আনুমানিক এক লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে, বাংলাদেশ ও চীন শিগগিরই পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের কৌশলগত সংলাপ ও প্রতিমন্ত্রী পর্যায়ের কূটনীতি এবং প্রতিরক্ষা সংলাপ শুরু করতে চায় বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিবের সঙ্গে সাক্ষাতে চীনা রাষ্ট্রদূতের আলোচনা হয়।
রোববার দুপুরে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে চীনের রাষ্ট্রদূতের কথা হয়। সাক্ষাৎকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে চীন সফরের আমন্ত্রণ জানান ইয়াও ওয়েন।
এ সময় সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেন রাষ্ট্রদূত ওয়েন।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর সফরের অংশ হিসেবে সিইআইজেড-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, মোংলা বন্দর আধুনিকায়নে একটি বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষর এবং মোংলা এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (ইপিজেড) প্রতিষ্ঠায় সম্ভাব্য সহযোগিতার বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফর দুই দেশের বিদ্যমান সুসম্পর্ককে আরও বিস্তৃত ও সুগম করবে।
সাক্ষাৎকালে তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প, পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের কৌশলগত সংলাপ দ্রুত শুরু এবং প্রতিমন্ত্রী পর্যায়ের ‘২+২’ কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা সংলাপ চালুর উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হয়।
এছাড়া বাংলাদেশ থেকে চীনে কাঁঠাল, আম ও পেয়ারা রপ্তানি শুরু, সৌরশক্তি, বৈদ্যুতিক যানবাহন সংযোজন কারখানা স্থাপন, চীন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর এবং রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদারের বিষয়গুলোও আলোচনায় আসে।
রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন গত এপ্রিল মাসে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী থাকাকালে রাষ্ট্রপতির চীন সফরের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।
ওই সফরে আইডিসিপিসির মন্ত্রী লিউ হাইশিংয়ের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎ এবং তার বাবা লিউ শু ছিংয়ের মাধ্যমে ১৯৮০ সালের আগস্টে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কাছে পরিচয়পত্র পেশের বিরল আলোকচিত্র ও ভিডিও হস্তান্তরের বিষয়টি স্মরণ করে রাষ্ট্রদূত ধন্যবাদ জানান।
সাক্ষাৎকালে উভয় পক্ষ বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করে বহুমাত্রিক সহযোগিতার মাধ্যমে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
শিগগিরই পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সংলাপ চায় দুদেশ: বাংলাদেশ ও চীন শিগগিরই পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের কৌশলগত সংলাপ ও প্রতিমন্ত্রী পর্যায়ের কূটনীতি এবং প্রতিরক্ষা সংলাপ শুরু করতে চায়। রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ও বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সাক্ষাতে এ বিষয়ে আলোচনা হয়।
প্রতিমন্ত্রী চীনকে বাংলাদেশের বিশ্বস্ত বন্ধু ও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে অভিহিত করেন এবং ‘এক-চীন নীতি’র প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সফল চীন সফরের পর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন গতি সঞ্চার এবং বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে ‘চীন-বাংলাদেশ যৌথ ভবিষ্যতের কমিউনিটি’ পর্যায়ে উন্নীত করার বিষয়ে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।
রাষ্ট্রদূত প্রতিমন্ত্রীকে তার দায়িত্ব গ্রহণের জন্য অভিনন্দন জানান এবং বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিতে তার সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি চীনের নির্বাহী উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকেও প্রতিমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানান।
রাষ্ট্রদূত প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরের ফলাফল ও অগ্রগতি সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রীকে অবহিত করেন। এর মধ্যে রয়েছে- ‘চীন অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, মোংলা বন্দর আধুনিকীকরণের বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষর এবং মোংলা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সম্ভাব্য সহযোগিতা।
তিনি উল্লেখ করেন যে, রয়েছে- ‘চীন অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল’-এ প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগসহ প্রায় ৩০টি চীনা কোম্পানি আকৃষ্ট হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা স্থানীয় বাংলাদেশিদের জন্য আনুমানিক ১ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
উভয় পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা করে, যার মধ্যে রয়েছে তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার বিষয়ে সহযোগিতা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের কৌশলগত সংলাপ দ্রুত শুরু করা এবং প্রতিমন্ত্রী পর্যায়ের কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা সংলাপের সূচনা।
এ ছাড়া, তারা বাংলাদেশ থেকে চীনে কাঁঠাল ও পেয়ারা রপ্তানির প্রক্রিয়া শুরু করা, চীন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা করেন।
রাষ্ট্রদূত প্রতিমন্ত্রীকে আসন্ন উচ্চপর্যায়ের সফর ও বিনিময় কার্যক্রম সম্পর্কেও অবহিত করেন। এর মধ্যে রয়েছে ‘চীন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা’-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী এবং ইউনান প্রদেশের নির্বাহী ভাইস গভর্নরের পরিকল্পিত বাংলাদেশ সফর।
রাষ্ট্রদূত প্রতিমন্ত্রীকে চলতি বছরের অক্টোবরে চীন সফরের আমন্ত্রণ জানান।