রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৩৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
রাষ্ট্রপতি কে হবেন সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান: মির্জা ফখরুল সরকার-ব্যবসায়ীদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব : প্রধানমন্ত্রী আইনের শাসনের সামনে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ আজ প্রেমিকা দিবস, সঙ্গীকে আনন্দ দেওয়ার দারুণ সুযোগ সাভারে তরী বাংলাদেশের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত ভোলার সাবেক ওসির বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের অভিযোগ, দুদকের অনুসন্ধানে মিলেছে প্রাথমিক সত্যতা আশুলিয়ায় প্রেশার কুকার বোমা উদ্ধার ছাত্রীর সঙ্গে আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল, অফিস সহকারীর জুলাইয়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যু ৩৬, আক্রান্ত ছাড়াল ৯ হাজার জুলাইয়ের চেতনাকে লাভজনক চেতনা বানাবেন না: তথ্যমন্ত্রী

আইনের শাসনের সামনে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ

জাবের আহম্মেদ রাইয়ান ; হেড অব নিউজ :
  • আপডেটের সময় : শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৯ টাইম ভিউ
আইনের শাসনের সামনে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ
জাবের আহম্মেদ রাইয়ান

একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি সামরিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা অবকাঠামোগত উন্নয়নে নয়; বরং আইনের শাসনের প্রতি নাগরিকের আস্থায় নিহিত। মানুষ যখন বিশ্বাস করে যে অপরাধের বিচার আদালতেই হবে, নিরপরাধ ব্যক্তি আইনের সুরক্ষা পাবেন এবং অপরাধী ব্যক্তি রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে বিচারের মুখোমুখি হবেন, তখনই একটি রাষ্ট্র কার্যকর ও ন্যায়ভিত্তিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। কিন্তু সেই আস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে সমাজে একই সঙ্গে দুটি বিপজ্জনক প্রবণতা বিস্তার লাভ করে—একদিকে সংঘবদ্ধ অপরাধ, কিশোর গ্যাং, মাদক ও চাঁদাবাজির বিস্তার; অন্যদিকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি বা মব জাস্টিস। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাস্তবতায় এই দুই সংকট পরস্পরকে আরও শক্তিশালী করছে এবং আইনের শাসনের জন্য বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (ASK)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে অন্তত ১৯৭ জন মব সহিংসতায় নিহত হয়েছেন। এই সংখ্যা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি বিচারব্যবস্থার প্রতি জনআস্থার সংকটেরও প্রতিফলন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, চুরির অভিযোগ কিংবা যাচাইহীন তথ্য ছড়িয়ে পড়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই উত্তেজিত জনতা আইন নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছে। পরে তদন্তে বহু ক্ষেত্রেই অভিযোগের সত্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, কিন্তু ততক্ষণে একটি জীবন নিভে গেছে। কোনো সভ্য রাষ্ট্রে বিচার যদি আদালতের পরিবর্তে রাস্তায় শুরু হয়, তবে শেষ পর্যন্ত কেউই নিরাপদ থাকে না।

১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে তোফাজ্জল হোসেনকে মোবাইল ফোন চুরির সন্দেহে গণপিটুনি দিয়ে হত্যার ঘটনা জাতিকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। পরবর্তীতে পুলিশ মামলা দায়ের করে এবং একাধিক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে। ঘটনাটি স্পষ্ট করে যে, অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগেই যখন জনতা বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একটি জীবন নয়; দুর্বল হয় রাষ্ট্রের আইনি ও সাংবিধানিক ভিত্তিও।

একই সময়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সংঘবদ্ধ কিশোর গোষ্ঠীর সক্রিয়তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বারবার উঠে এসেছে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক পরিবহন ও সহিংস অপরাধে এসব গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা বাড়ছে। এর পেছনে রয়েছে পারিবারিক তদারকির অভাব, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া, বেকারত্ব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার এবং অপরাধচক্রের প্রলোভন।

জাতিসংঘের শিশু তহবিল (UNICEF) দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, কিশোর অপরাধকে শুধু আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; শিক্ষা, পরিবারভিত্তিক তদারকি, মানসিক সহায়তা ও পুনর্বাসনকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একইভাবে জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (UNODC) দেখিয়েছে, সংঘবদ্ধ অপরাধ, মাদক ব্যবসা ও যুব অপরাধ একে অপরকে শক্তিশালী করে। বাংলাদেশের বাস্তবতাও এর ব্যতিক্রম নয়। ইয়াবার পাশাপাশি ক্রিস্টাল মেথ বা ‘আইস’-এর বিস্তার নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। নিয়মিত অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার হলেও পাচার নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভাঙা সম্ভব হয়নি। মাদকচক্র এখন কিশোরদের বাহক, খুচরা বিক্রেতা ও স্থানীয় যোগাযোগকারী হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে মাদক, কিশোর গ্যাং ও ছিনতাইকে আলাদা সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এগুলো একই অপরাধচক্রের বিভিন্ন রূপ।

বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭, ৩১ ও ৩২ নাগরিকের আইনের দৃষ্টিতে সমতা, আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার এবং আইন অনুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত না করার নিশ্চয়তা দিয়েছে। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত হলেও তার বিচার আদালতেই হতে হবে; জনতার হাতে নয়। একইভাবে রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক প্রভাব কিংবা অর্থনৈতিক ক্ষমতা কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পারে না। চাঁদাবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার বা রাজনৈতিক প্রভাবের আড়ালে সংঘটিত অপরাধও আইনের শাসনের জন্য সমানভাবে ক্ষতিকর। কারণ অপরাধীর পরিচয় যখন বিচারের মানদণ্ড হয়ে ওঠে, তখন আইনের প্রতি মানুষের আস্থা অনিবার্যভাবেই দুর্বল হয়।

এই বাস্তবতা মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত রাষ্ট্রীয় কৌশল। মব সহিংসতার প্রতিটি ঘটনার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে মাদকের সরবরাহব্যবস্থা, অর্থায়নের নেটওয়ার্ক এবং সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিং, কমিউনিটি পুলিশিং এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব মোকাবিলার সক্ষমতাও জোরদার করা জরুরি।

এর পাশাপাশি বিচারব্যবস্থার দক্ষতা ও গতি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। বিচার বিলম্বিত হলে বা বিচারহীনতার ধারণা তৈরি হলে সেই শূন্যস্থানেই মব জাস্টিসের মতো বিপজ্জনক প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও মনে করে, সহিংসতা প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি শিক্ষা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও মানসিক সহায়তাভিত্তিক প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সবশেষে মনে রাখতে হবে, মব জাস্টিস, কিশোর গ্যাং, মাদক কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের আড়ালে চাঁদাবাজি এসব কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; এগুলো একই সংকটের বহুমাত্রিক প্রকাশ। তাই সমাধানও হতে হবে সমন্বিত, প্রাতিষ্ঠানিক এবং আইনের সমান ও নিরপেক্ষ প্রয়োগনির্ভর।

রাষ্ট্রের শক্তি অস্ত্রে নয়, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগে। যে রাষ্ট্রে অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই বিচারের একমাত্র মানদণ্ড হয়, সেই রাষ্ট্রেই নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, বিনিয়োগে আস্থা ফিরে আসে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের উত্তরাধিকার পায়। আইনের শাসনের প্রতি মানুষের বিশ্বাস পুনর্গঠন আজ বাংলাদেশের জন্য কেবল আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ রক্ষার অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো খবর