মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা নিয়ে প্রস্তাবিত ১৫ দফা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, হামাস ‘প্রকৃত অর্থে নিরস্ত্র’ না হওয়া পর্যন্ত গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে না।
ইসরায়েলের মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে নেতানিয়াহু বলেন, ‘ইসরায়েল ১৫ দফা নথিটি প্রত্যাখ্যান করছে।’ তার দাবি, ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারের আগে হামাসকে তাদের সব অস্ত্র সমর্পণ করতে হবে।গত মাসের শেষ দিকে গাজায় যুদ্ধবিরতির মার্কিন উদ্যোগে বড় অগ্রগতির ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছিলেন, হামাসসহ গাজার অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠী একটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনায় সম্মত হয়েছে। এর আওতায় তারা নতুন একটি ফিলিস্তিনি প্রশাসনের কাছে অস্ত্র সমর্পণ করবে এবং নিরস্ত্রীকরণের অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার শুরু করবে ইসরায়েল।
তবে অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে নিজের ডানপন্থী সমর্থকদের চাপের মুখে থাকা নেতানিয়াহু গত কয়েক দিনে পরিকল্পনাটি নিয়ে ক্রমেই কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি পুরো ১৫ দফা পরিকল্পনাই প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিলেন।
ট্রাম্পের ১৫ দফা পরিকল্পনায় কী আছে?
গত ৩০ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘বোর্ড অব পিস’ গাজার জন্য ১৫ দফার একটি রোডম্যাপ প্রস্তাব করে। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় নিরস্ত্রীকরণ, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং পুনর্গঠনের জন্য ধাপে ধাপে ও শর্তসাপেক্ষ একটি কাঠামো তুলে ধরা হয় এতে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ ইসরায়েলি সামরিক প্রত্যাহারের বিনিময়ে হামাসকে নিরস্ত্র হতে হবে। একই সঙ্গে গাজার শাসনভার একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি ন্যাশনাল কমিটির কাছে হস্তান্তরের কথা বলা হয়েছে। এই প্রশাসনকে সহায়তা করবে একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী।
গত অক্টোবরে ট্রাম্পের উদ্যোগে ‘বোর্ড অব পিস’ গঠন করা হয় এবং তিনি এর আজীবন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সংস্থাটি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নেতৃত্বাধীন। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাবে গাজার শান্তি পরিকল্পনা তদারকির দায়িত্বও এই বোর্ডকে দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী, পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হওয়ার কথা। হামাসের নিরস্ত্রীকরণ যত এগোবে, গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারও তত এগোবে।
তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা রয়েছে। হামাস বলছে, তাদের পক্ষ থেকে চুক্তি বাস্তবায়ন নির্ভর করবে ইসরায়েল প্রতিশ্রুতি কতটা পালন করে এবং গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান বন্ধ হয় কি না, তার ওপর। গত মাসে হামাসের আলোচক দলের এক সদস্য আল জাজিরাকে বলেছেন, ইসরায়েল তার অঙ্গীকার পূরণ করলেই হামাস চুক্তি বাস্তবায়নের পথে এগোবে।
অন্যদিকে, চলতি সপ্তাহের শুরুতে বোর্ড অব পিস জানিয়েছে, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ পুরোপুরি শেষ হওয়ার পরই গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে। ফলে নিরস্ত্রীকরণ ও সেনা প্রত্যাহার—কোনটি আগে হবে, তা নিয়েই এখন বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধে ৭৩ হাজার ৩০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে হামাসের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ‘যুদ্ধবিরতিতে’ সম্মত হওয়ার পরও গাজায় ইসরায়েলি হামলায় আরও ১ হাজার ২০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে কী বললেন নেতানিয়াহু?
নেতানিয়াহু বলেছেন, হামাস পুরোপুরি নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কোনো ধরনের প্রত্যাহার কার্যকর করবে না। তিনি বলেন, ‘হামাস প্রকৃত অর্থে নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করবে না এবং আমাদের বাহিনী ও নাগরিকদের বিরুদ্ধে হুমকি মোকাবিলা অব্যাহত রাখবে।’
তবে পরিকল্পনা নিয়ে ইসরায়েলের আপত্তিগুলো ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। নেতানিয়াহু বলেন, ‘তাদের কিছু ধারণা আছে। সেগুলোর কিছু আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য, কিছু গ্রহণযোগ্য নয়। আর এসব বিষয়ে কীভাবে নিজেদের অবস্থানে অটল থাকতে হয়, তা আমরা জানি।’
অক্টোবরে ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। ধারাবাহিক কয়েকটি জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর জন্য কঠিন নির্বাচনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, হামাসকে অবশ্যই তাদের সব অস্ত্র ছেড়ে দিতে হবে। তার ভাষায়, ‘আমরা প্রকৃত নিরস্ত্রীকরণের কথা বলছি, লোকদেখানো নিরস্ত্রীকরণের কথা নয়।’
হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজা থেকে ইসরায়েলের সম্ভাব্য সেনা প্রত্যাহার—দুটিই নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী সরকারের জন্য অত্যন্ত বিতর্কিত বিষয়। ফলে নির্বাচন এত কাছে চলে আসায় নেতানিয়াহু যেন পুরো প্রক্রিয়াটিকে আবার শুরুর অবস্থানে নিয়ে গেছেন এবং স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তার নেতৃত্বে এসব ঘটবে না।
এই অবস্থান বোর্ড অব পিস এবং কয়েক মাস ধরে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ও গাজা থেকে ধাপে ধাপে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের পথ খুঁজতে থাকা মধ্যস্থতাকারীদের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করেছে।
গাজায় কী প্রতিক্রিয়া?
যুদ্ধবিধ্বস্ত উপত্যকাটির অধিকাংশ মানুষই ইসরায়েল এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করবে বলে ধারণা করেছিলেন। তবে এখন তাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো—এই প্রত্যাখ্যান গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
১৫ দফা পরিকল্পনাটি মূলত একটি কাঠামোবদ্ধ প্রক্রিয়া তৈরির কথা ছিল। এর গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর মধ্যে ছিল ইসরায়েলের দখলে থাকা তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর প্রবেশ।
কিন্তু ইসরায়েলের সরাসরি প্রত্যাখ্যানের ফলে কোন পদক্ষেপ কখন এবং কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা এখন গুরুতর প্রশ্নের মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে গাজায় চলমান সংঘাতের একটি স্পষ্ট সমাপ্তির সম্ভাবনাও আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
ফিলিস্তিনি আলোচক দলের সাবেক উপদেষ্টা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাভিয়ের আবু ঈদ বলেন, গত বছরের শেষ দিকে বোর্ড অব পিস এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাব মেনে নেওয়া হয়েছিল মূলত গাজায় যুদ্ধ বন্ধের পথ হিসেবে।
তবে তার মতে, শুরু থেকেই স্পষ্ট ছিল যে ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনা এবং পরবর্তী ১৫ দফা নিরস্ত্রীকরণ ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের চেয়ে ইসরায়েলের স্বার্থই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
আবু ঈদের মতে, ফিলিস্তিনিদের জন্য ন্যায়বিচারের বিষয়টি আলোচনায় প্রায় অনুপস্থিত। নেতানিয়াহুর এই প্রত্যাখ্যানে ট্রাম্পও সন্তুষ্ট হওয়ার কথা নয়। তবে একই সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগে নেতানিয়াহুকে জবাবদিহির আওতায় আনতে ট্রাম্প প্রশাসন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কী বলছেন বিশ্লেষকেরা?
ইসরায়েলি বিশ্লেষক ড্যান পেরির মতে, গাজা পরিকল্পনার বিরুদ্ধে নেতানিয়াহুর অবস্থান ইসরায়েলের সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশ কী চায়, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি বলেন, হামাসকে নিয়ে তার কোনো মোহ নেই। কিন্তু হামাস যদি আনুষ্ঠানিকভাবেও নিরস্ত্রীকরণে সম্মত হওয়ার অবস্থানে আসে, সেটিকে স্বাগত জানানো উচিত। পেরির মতে, ইসরায়েলের নিরাপত্তার দাবি এবং গাজার ফিলিস্তিনিদের মানবিক বিপর্যয় থেকে মুক্তি ও পুনর্গঠনের প্রয়োজনকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই।
অন্যদিকে ইসরায়েলের সাবেক কূটনীতিক অ্যালন পিনকাস মনে করেন, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিকভাবে প্রয়োজন ‘অনন্ত যুদ্ধ’। তাঁর মতে, গাজা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্তকে আগামী ২৭ অক্টোবরের ইসরায়েলি নির্বাচনের প্রেক্ষাপটেই দেখতে হবে।
পিনকাসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নেতানিয়াহু হিসাব করেছেন যে ট্রাম্পের পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করা তার জন্য রাজনৈতিকভাবে খুব বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হবে না। কারণ হামাস এখনো নিরস্ত্র হয়নি এবং নেতানিয়াহু মনে করছেন, এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের বিরোধিতা করেও তিনি বড় ধরনের চাপ এড়িয়ে যেতে পারবেন।
ফলে ট্রাম্পের ১৫ দফা পরিকল্পনা ঘিরে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের মধ্যে কোনটি আগে ঘটবে। ইসরায়েল যদি পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের আগে সেনা সরাতে রাজি না হয় এবং হামাস যদি ইসরায়েলের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা ছাড়া অস্ত্র ছাড়তে না চায়, তাহলে পুরো পরিকল্পনার বাস্তবায়নই অচলাবস্থায় পড়ে যেতে পারে।