ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের (মমেক) ভাইস প্রিন্সিপাল এবং বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ড্যাবের সভাপতি ডা. বদরউদ্দিন সোহেল ও সাবেক মমেক ছাত্রদল নেতা ডা. ইমতিয়াজ আহমেদ সিয়ামের একটি আপত্তিকর ও গালাগালিপূর্ণ ফোনালাপ সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। অডিওতে ডা. সোহেল তার নিজ সংগঠনের সিনিয়র নেতাদের প্রতি অত্যন্ত তুচ্ছতাচ্ছিল্য, আপত্তিকর গালাগাল এবং কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। এ ঘটনার পর থেকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও স্থানীয় রাজনীতিতে চরম চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ফাঁস হওয়া ফোনালাপে শোনা যায়, কথোপকথনের শুরুতেই ডা. সোহেল তার আর্থিক সুবিধার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমার তো ভাই কইরা খাইতে হইবো।’ এরপর ছাত্রদল নেতা ডা. সিয়াম বিভাগীয় সাংগঠনিক উপ-কমিটির একটি মিটিংয়ের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘সেখানে সায়েম ভাই (ড্যাবের বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক) বাদে বাকি সবাই এক পক্ষে ছিলেন। সায়েমের ভূমিকা নিয়ে বলতে গিয়ে ডা. সোহেল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বলদ যদি এটা খায় খাইবো… এখনো বদর উদ্দিন সোহেল কারও বিরুদ্ধে কোনো রাজনীতি করে নাই। আমার বিরুদ্ধেই সায়েম রাজনীতি করছে। কিন্তু আমি এইডারে গুনায় ধরি নাই।’
ফোনালাপে তিনি আরও মন্তব্য করেন, সায়েম কথা বলার সময় নিজের ওজন ধরে রাখতে পারে না এবং মাঝে মাঝে নিজেকে কেন্দ্রীয় নেতা ডা. ফরহাদ হালিম ডোনারের চেয়েও বড় নেতা মনে করে।
ড্যাবের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার সম্বন্ধে ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও অসম্মানজনক সম্বোধন করে ডোনার মিয়াঁ বলে। সোহেল আরও বলেন, ‘ডোনার মিয়া (ডা. ডোনার, ড্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা) জাহিদ হোসেনরে (ডা. মো. জাহিদ হোসেন, বর্তমান সমজকল্যাণমন্ত্রী) এখন আমার না হইলেও চলে।’
কথোপকথনে ডা. সিয়াম যখন আরেক চিকিৎসক নেতা ড্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডা. ইসহাককে ‘সাইজ’ করার প্রস্তাব দেন, তখন ডা. সোহেল তাকে থামিয়ে দিয়ে নিজের আধিপত্যের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘সাইজ করমু নাকি করমু না এইটা আমার বিষয়। তারা ময়মনসিংহের পোলা চরপাড়ার পোলা, আমার বা**ডা ছিড়বো।’ নিজের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তিনি আরও বলেন, তিনি ভাইস প্রিন্সিপাল হওয়ার প্রথম দিনই ফারুকের কমিটি (ডা. মাহমুদুল হাসান ফারুক, সহযোগী অধ্যাপক, শিশুবিভাগ) ‘খেয়ে দিয়েছেন এবং জমা দেওয়া এক্সামিনার তালিকা থেকে শোয়েবসহ ( ডা. শোয়েব, অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজী বিভাগ) অনেকের নাম কেটে দিয়েছেন।
নিজ দলের সিনিয়র নেতাকে গালাগাল ও হুমকি
ড্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জিকুর প্রসঙ্গ উঠলে ডা. সোহেল অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ভাষায় তাঁকে আক্রমণ করেন। ডা. জিকু অন্য বলয়ের চিকিৎসকদের সঙ্গে মেলামেশা করায় চরম ক্ষুব্ধ হয়ে ডা. সোহেল তাকে বলেন, ‘তোমার মতো এমন বাইনচোদ মাল তো আমি দেখি নাই। তুমি কত বড় বাইনচোদ, তুমি একটা সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, আমি যেই দুইদিন থাকি নাই দুইদিন তো তুমি প্রেসিডেন্ট। তুমি সেটা ব্যবহার না কইরা পাঁচ-ছয় বছরের জুনিয়রের পিছনে ঘুরো। তোমার নেতৃত্ব কেমনে তৈরি হইবো?’
ডা. সোহেল আরও বলেন, ‘পদোন্নতি ও ক্যারিয়ারের ভয় দেখিয়ে তিনি ডা. জিকুকে (ডা জাকির হোসেন জিকু, সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান অর্থোপেডিক্স, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ড্যাব ময়মনসিংহ) কোণঠাসা করে রেখেছেন।’ তিনি বলেন, ‘তুমি হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট হইয়া অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, লজ্জা করে না? সিনিয়রিটি টিচারশিপ—এখানে নেতা হইতে গেলে তোমার শিক্ষকতা থাকবে না… আল্লাহ আল্লাহ করে দোয়া করো আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে যদি অর্ডার হয়ে যায়। তারপর একটা অ্যাপ্লিকেশন দিবা, আমি বুঝবো তোমারে প্রফেসর কেমনে বানাইতে হয়।’
তিনি আরও দাবি করেন, ‘ডা. জিকু ড্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাকে কোনো কর্মসূচিতে ডাকছেন না এবং তার জায়গায় ‘ডা. রবিন’ নামের অন্য একজনকে সামনে দাঁড় করিয়ে ডা. জিকুকে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছেন। ডা. সোহেলের ভাষ্যমতে, ‘আমি তারে এখন খাইয়া দিছি, কোথাও তারে আর ডাকি না।’
রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড়
একজন চিকিৎসক, মমেকের ভাইস প্রিন্সিপাল এবং পেশাজীবী সংগঠনের শীর্ষ নেতার মুখে এমন কুরুচিপূর্ণ ভাষা ও সহকর্মীদের প্রতি ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে। সাধারণ চিকিৎসক ও বিএনপি সমর্থক নেতাকর্মীদের মধ্যে এ নিয়ে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর থেকে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।