রাজধানীর মিরপুর দিয়াবাড়ি সংলগ্ন লঞ্চ টার্মিনালের বিপরীতে ফারুক ওরফে বাঁশ ফারুককে ঘিরে উঠেছে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ। ধর্ষণ, সরকারি জমি দখল এবং মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুতর কর্মকাণ্ডের অভিযোগ থাকলেও তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে স্থানীয়দের মধ্যে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে-বাশ ফারুকের খুঁটির জোর কোথায়?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাঁশ ফারুকের বিরুদ্ধে মদ্যপান করে ধর্ষণ, গর্ভপাত, বিয়ে ছাড়া সংসার, সন্তান জন্ম দেয়া ও বিয়ে না করেই তালাক প্রদান করার অভিযোগ এনে এক নারীর বক্তব্য রয়েছে প্রতিবেদকের কাছে। ওই নারী তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেছেন তার বক্তব্যে। সংশ্লিষ্ট ঘটনার বিষয়ে থাকা বক্তব্য ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণও বিষয়টিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের দাবি তৈরি করেছে।
অন্যদিকে, সরকারি জমি দখলের অভিযোগও রয়েছে বাশ ফারুকের বিরুদ্ধে। যে জায়গাটি দখলের অভিযোগ উঠেছে, সেই জমির অবস্থান, দখলের ধরন এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিগত সময়ে আওয়ামীলীগের প্রভাব খাটিয়ে সরকারি সম্পত্তি দখলের এমন কর্মকাণ্ড চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। দিয়াবাড়ি লঞ্চ টার্মিনাল এর বিপরীতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা দখল করে রাম রাজত্ব করে যাচ্ছে ফারুক ওরফে বাঁশ ফারুক। যেখানে ফারুকের কার্টনের গোডাউন রয়েছে ৫টি, যার সম্ভাব্য মাসিক ভাড়া ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা, রুম ভড়া দেয়া রয়েছে ৬টি, যার সম্ভাব্য মাসিক ভাড়া ২৫ হাজার টাকা, বাশের দোকান রয়েছে ৩টি যার সম্ভাব্য মাসিক ভাড়া ৩০ হাজার টাকা।
প্রতিমাসে সরকারি জমি ভাড়া দিয়েই বাঁশ ফারুকের ইনকাম ২লাখ টাকার বেশি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ উঠেছে, মাদক বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে। স্থানীয়দের দাবি, বাশ ফারুকের ভাড়া দেয়া বাসায় “রুণা” নামের এক মহিলা প্রতিদিন প্রায় লাখ টাকার গাঁজা বিক্রি করে। সেখান থেকে প্রতিমাসে উৎকোচ নিয়ে মাদক বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ করছে এই বাঁশ ফারুক নিজেই। “রুণা” নামের ওই মহিলার গাঁজা বিক্রি সংক্রান্ত ভিডিও ফুটেজও রয়েছে প্রতিবেদকের কাছে, যেখানে মাদক কেনাবেচার দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া ধর্ষণ,শিশু গর্ভপাত, বিয়ে ছাড়া সংসার, সন্তান জন্ম দেয়া ও বিয়ে না করেই তালাক প্রদান করার অভিযোগ এনে বাঁশ ফারুকের বিরুদ্ধে পারভীন নামের এক নারী তার বক্তব্যে এমন অভিযোগ তুলেছেন। পারভীন নামের ওই ভুক্তভোগী নারী বলেন, অন্তত আরো আট বছর পূর্বে ফারুকের কার্টনের গোডাউনে কাজ করতেন ওই কিশোরী পারভীন, তার বক্তব্য অনুযায়ী তার বয়স তখন ১১ থেকে ১২ বছর। ফারুকের কার্টনের গোডাউনের পাশের একটি ফাঁকা রুমে থাকতেন পারভিন ও তার সহকর্মী একটি মেয়ে। যেখানে তারা শুধু রাতে থাকতেন। দিনের বেলা ওই রুমটি ফাঁকা থাকতো সবসময়।
ফারুক ও তার সাঙ্গবাঙ্গরা মিলে ওই রুমে মাদক সেবন ও মদ্যপান করত বলে জানায় ভুক্তভোগী নারী পারভীন। হঠাৎ একদিন পারভীনের সহকর্মী গ্রামের বাড়িতে থাকার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রাতে মদ্যপান করে, পারভীন নামের ওই কিশোরীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে ফারুক ওরফে বাঁশ ফারুক। ভুক্তভোগী নারী পারভীনের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সময়ে পারভীন খুব ছোট থাকায় প্রচন্ড রক্তক্ষরণ হলে, ফারুক তাকে ওই রাতেই চিকিৎসা করিয়ে ভয় ভীতি দেখায়। এবং এই ঘটনা কাউকে বললে তাকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি ও তার কাজের বেতন না দেয়া হবে না বলে জানায়।
কিশোরী পারভীন তখন ভয়ে কাউকে এই ঘটনা প্রকাশ করেনি। পরবর্তীতে ফারুক ওই একদিনের শারীরিক সম্পর্ককে পুঁজি করে ভয়-ভীতি ও বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে লাগতার কিশোরী পারভীনের সাথে শারীরিক সম্পর্ক চালিয়ে যায়। পরবর্তীতে একটা সময় ফারুকের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে কিশোরী পারভীন এবং তাদের মধ্যে একটি সু-সম্পর্ক তৈরি হলে এক সময় গর্ভবতী হয়ে পড়েন পারভীন। পারভীন গর্ভবতী হলে ফারুকের কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করতেই, ফারুক পারভীনকে বলে, তোমার বয়স অনেক কম তাই আমরা এখন বিয়ে করতে পারব না, বাচ্চাটি নষ্ট করে ফেলতে হবে।
এই বলে ফারুক পারভীনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় ভয়ে মাঝপথ থেকে পারভীন বাসায় চলে আসে। পরবর্তীতে বাচ্চা নষ্ট করার ওষুধ এনে পারভীনকে খাওয়ায় ফারুক, যার ফলে বাচ্চাটি গর্ভপাত হয়ে যায়। প্রচন্ড রক্তক্ষরণে পারভীন অসুস্থ হয়ে পড়লে তার পরিবারে এসব বিষয় কিছুটা জানাজানি হয়। পরবর্তীতে পারভীন সুস্থ হলে তার পরিবার থেকে তাকে বিয়ে দেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়। বিয়েতে অসম্মতি থাকা সত্ত্বেও ফুপাতো ভাইয়ের সাথে বিয়ে ঠিক করে পারভীনের পরিবার। ফুপাতো ভাইয়ের সাথে বিয়ে হলেও হয়নি সংসার।
শ্বশুরবাড়ি তুলে নেয়ার আগেই ফারুক তাকে তার গ্রামের বাড়ি থেকে ভাগিয়ে নিয়ে আসে ঢাকায়। এবং ফারুকের তত্ত্বাবধায়নেই ওই ফুফাতো ভাইকে ডিভোর্স করে পারভীন। ফুপাত ভাইকে ডিভোর্স দিয়ে ফারুকের সাথে রাজধানীর টংগী এলাকায় অবৈধ সংসার শুরু করে পারভীন। কিছুদিন অতিবাহিত হলে পারভিন ফারুককে বিয়ের জন্য চাপ দিলে ফারুক পারভীনকে জানায়, জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকার কারণে এবং প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়ায় এই মুহূর্তে এই এলাকায় বসে তাকে বিয়ে করা সম্ভব নয়। কারণ এটি অন্য একটি এলাকা এখানে ফারুকের পরিচিত কেউ নেই।
যদি মিরপুরে হয় তাহলে তার পরিচিত অনেক লোকজন আছে, সেখানে বিয়ে করা সম্ভব বলে পারভীনকে জানায় ফারুক। এরপরেই শুরু হয় ফারুকের ভয়াবহ নাটকীয়তা, পারভীনকে মিরপুরে এনে ভুয়া জন্ম নিবন্ধন তৈরি করে, পারভীনকে দেখিয়ে বলে, তোমার কোথাও যেতে হবে না, তোমার স্বাক্ষর আমি করে দিব,কারণ এটা জানাজানি হলে সমস্যা আছে। এসব কথা বলে পারভীকে ভুলভাল বুঝিয়ে, তাকে বলে তাদের বিয়ে হয়ে গেছে।
ফারুকের কথা অনুযায়ী তাদের বিয়ে হয়ে গেছে,এমন সত্যতাকে মেনে নিয়ে ফারুকের সাথে পারভীনের সংসার শুরু হয় পুনরায়। যে সংসারে বর্তমানে চার বছরের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে, গত দুই বছর পূর্বে ফারুকের পরিবারে এসব বিষয় জানাজানি হলে, ফারুকের পরিবার থেকে প্রথম স্ত্রী-সন্তান ও ফারুকের বড় বোন কর্তৃক নিম্নচাপ শুরু হয় ফারুকের উপর। পরবর্তীতে মেয়েকে দেখার কথা বলে টঙ্গী থেকে পারভীনকে মিরপুরে আসতে বলে ফারুক। মেয়েকে নিয়ে পারভীন মিরপুরে এলে, ফারুকের বোনের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয় পারভীনকে।ওই সময়ে ফারুক পারভীনকে তার বোনের বাসায় পাঠিয়ে বাসার নিচে অবস্থান করে।
ফারুকের বড় বোন ও ফারুকের প্রথম স্ত্রী-সন্তানরা পারভীনকে জিজ্ঞেস করে, ফারুকের সাথে তার কিষের সম্পর্ক? এবং এই কন্যা সন্তান কার? এক বাক্যেই পারভীন উত্তর দেয়, ফারুক তার স্বামী এবং এই কন্যা সন্তান ফারুকের। পারভীনের এমন উত্তরে হতবাক হয় ফারুকের প্রথম স্ত্রী-সন্তান ও বড় বোন। ফারুকের বড় বোন পারভীনকে বলে আচ্ছা তোমরা যে বিয়ে করেছ, তাহলে তোমাদের বিয়ের কাগজপত্র কোথায় সেগুলো দেখাও। অকপটেই পারভীন বলে, সেগুলো আপনার ভাইয়ের কাছে আছে। পারভীনের এমন উত্তরে ফারুককে উপরে ডেকে নেওয়া হয় ফারুকের বোনের বসায়।
তখন ফারুকের বড় বোন ফারুককে জিজ্ঞেস করে, এই সন্তান নাকি তোর? আর এই মেয়ে নাকি তোর স্ত্রী? এটা কি সত্য? তুই নাকি ওকে বিয়ে করেছিস? বিয়ের কাগজপত্র নাকি তো কাছে আছে? এমন প্রশ্নে অকোপটেই ফারুক সবকিছু অস্বীকার করে বসে! ফারুক সাফ জানিয়ে দেয়, এই সন্তানও তার নয় এবং এই মেয়ে পারভীনও তার স্ত্রী নয়, এবং তাদের কোন বিয়েও হয়নি। ফারুকের এমন কথা শুনে পারভীনের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ে।
ওই রাতেই পারভীন কে বেধড়ক মারধর করে ৩০০ টাকার একটি স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক স্বাক্ষর রেখে ও এই সন্তান নিয়ে কোনদিন ফারুকের কাছে আর কোন কিছুর দাবি করতে পারবে না এমন একটি ভিডিও ধারণ করে সন্তানসহ পারভীনকে বের করে দেয় ফারুক ও তার পরিবার। পরবর্তীতে ওই স্ট্যাম্পটিকে তালাকনামা হিসেবে প্রদর্শন করা হয়, যেখানে উল্লেখ করা হয় ৫০ হাজার টাকা খোরপোষ ও ভরণপোষণ বাবদ দেয়া হয়েছে। অথচ পারভীনের দেয়া বক্তব্য অনুযায়ী, কোন কাজী অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়নি পারভীনকে, কোথাও কোন কাগজে স্বাক্ষর করেনি পারভীন,এমনকি কোন মোল্লা বা হুজুরকে বাসায় এনেও কবুল বলানো হয়নি তাকে। তাহলে প্রশ্নটা কি দাঁড়ায়? বিয়ে না হলেও হয়েছে তালাক!
সন্তান থাকলেও নেই সন্তানের পিতৃ পরিচয়! এবার সমাজের কাছে প্রশ্ন থেকে যায়, পারভীন যে ভুল করেছে সে তার ভুলের শাস্তি পেয়েছে, জীবন থেকে পেয়েছে চরম শিক্ষা! তাহলে পারভীন ও ফারুকের ঔরসজাত যে চার বছরের কন্যা সন্তানটি তার পিতৃ পরিচয় কি? অবুঝ চার বছরের কন্যা সন্তানটির নাম ফারজানা ইসলাম। জন্ম নিবন্ধন তৈরি করতে প্রয়োজন পিতার এনআইডি কার্ড ও মায়ের এনআইডি কার্ড এবং ফারজানা ইসলামের টিকার কার্ড। এদিকে ফারুক তার মেয়ের টিকার কার্ডটিকে জন্ম নিবন্ধন বানিয়ে দেয়ার কথা বলে তার কাছে এনে আটকে রেখেছে। আগামী বছর সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করাবে বলে অন্তত জন্ম নিবন্ধন বানিয়ে দিতে অনেক আকুতি মিনতি করেও কথিত পাষান পিতার মন গলাতে পারেনি কথিত স্ত্রী পারভীন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, এতসব গুরুতর অভিযোগ ও তথ্য-প্রমাণ থাকার পরও ফারুক ওরফে বাঁশ ফারুক কীভাবে নির্বিঘ্নে তার কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন? তার পেছনে কি কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে? নাকি সংশ্লিষ্টদের নীরবতার সুযোগেই তিনি প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন?
এলাকাবাসীর দাবি, অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যতা যাচাই এবং প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে সরকারি জমি দখলের অভিযোগ তদন্ত করে প্রকৃত মালিকানা ও দখলের বিষয়টি পরিষ্কার করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
গুরুতর এসব অভিযোগগুলোর বিষয়ে মুঠোফোনে বাঁশ ফারুকের বক্তব্য জানতে চাইলে, সরকারি জায়গা দখলের বিষটি অকোপটে স্বীকার করেন ফারুক, মদ্যপান করে কিশোরী পারভীনকে ধর্ষণ ও গর্ভপাতের বিষয়টি এড়িয়ে গেলেও পারভীনকে কোর্টের মাধ্যমে বিয়ের কথা স্বীকার করেন তিনি। তবে সেই বিয়ের কোন কাগজপত্র নেই বলেও জানান বাঁশ ফারুক। কাগজপত্র বিহীন কিভাবে বিয়ে হল এমন প্রশ্নে উত্তেজিত হয়ে প্রতিবেদককে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে এসব বিষয়ে বেশি ঘাঁটাঘাটি না করার জন্য হুমকি দেয় ফারুক।