সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ০৩:৪০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :

শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচার উপায়

ধর্ম ডেস্ক :
  • আপডেটের সময় : সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬
  • ১১ টাইম ভিউ
শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচার উপায়

মানুষের জীবনের অন্যতম বড় পরীক্ষা হলো শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে নিজেকে রক্ষা করা। ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, শয়তান মানবজাতির প্রকাশ্য শত্রু। সে শুরু থেকেই মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের পথ থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করে আসছে। তার লক্ষ্য হলো মানুষকে আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে ধাবিত করা এবং পরকালে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া।

শয়তানের শত্রুতার সূচনা হয়েছিল হজরত আদম (আ.)-কে সিজদা করার নির্দেশ অমান্য করার মাধ্যমে। অহংকার ও অবাধ্যতার কারণে সে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়। কিন্তু নিজের ভুল স্বীকার করে তওবা করার পরিবর্তে সে মানুষকে বিভ্রান্ত করার পথ বেছে নেয়। কিয়ামত পর্যন্ত অবকাশ চেয়ে সে মানবজাতিকে বিপথগামী করার অঙ্গীকার করে।

কোরআনে আল্লাহ বললেন, ‘আমি যখন নির্দেশ দিয়েছি, তখন তোকে কিসে সিজদা করতে বারণ করল? সে বলল, আমি তার চাইতে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে আগুন দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি দিয়ে। ’আল্লাহ বললেন, তুই এখান থেকে যা। এখানে অহংকার করার কোনো অধিকার তোর নাই। অতএব তুই বের হয়ে যা। তুই হীনতমদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা: আরাফ, আয়াত: ১২, ১৩)

পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ তাআলা মানুষকে শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে নিষেধ করেছেন। কারণ শয়তান কখনো মানুষের কল্যাণ চায় না। সে মানুষের অন্তরে সন্দেহ সৃষ্টি করে, পাপকে সুন্দর করে উপস্থাপন করে এবং ধীরে ধীরে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

তবে মহান আল্লাহ মানুষকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেননি। তিনি নাজিল করেছেন পবিত্র কোরআন, দান করেছেন বিবেক, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা। পাশাপাশি যুগে যুগে নবী-রাসুল পাঠিয়ে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য স্পষ্ট করে দিয়েছেন। যারা আল্লাহর নির্দেশনা অনুসরণ করে এবং তাঁর স্মরণে নিজেদের ব্যস্ত রাখে, তারা শয়তানের ধোঁকা থেকে নিরাপদ থাকতে পারে।

ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, শয়তানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো গাফিলতি। যখন মানুষ নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির ও ইবাদত থেকে দূরে সরে যায়, তখন শয়তান তার ওপর সহজেই প্রভাব বিস্তার করতে পারে। তাই একজন মুমিনের উচিত নিয়মিত ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে নিজের ঈমানকে শক্তিশালী রাখা।

এ ছাড়া আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা, কোরআন তিলাওয়াত করা, সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন দোয়া পড়া এবং নেককার মানুষের সঙ্গ গ্রহণ করাও শয়তানের প্ররোচনা থেকে বাঁচার গুরুত্বপূর্ণ উপায়। বিশেষ করে সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে অকল্যাণ থেকে আশ্রয় চাওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।

শয়তান মানুষের চিরশত্রু। সে চায় সব মানুষকে জাহান্নামের পথে পরিচালিত করতে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন, যাতে সে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে সঠিক পথ বেছে নিতে পারে। তাই একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো শয়তানের ধোঁকা, প্ররোচনা ও কুমন্ত্রণা থেকে সতর্ক থাকা এবং আল্লাহর নির্দেশিত পথে অবিচল থাকার চেষ্টা করা। এই চিরশত্রু শয়তানের ধোঁকা, কুমন্ত্রণা ও প্রভাব থেকে আত্মরক্ষা করতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল নিয়মিত পালন করা জরুরি।

 ১. ইখলাসের সঙ্গে কাজ করা 

ইখলাস মানে সব কাজ কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই করা। শয়তানের সন্তুষ্টির জন্য কিছু করলে সে শয়তানের দলভুক্ত হবে। আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন,

‘আমি তুই আর তাদের মধ্যে যারা তোর অনুগামী হবে তাদের সকলের দ্বারা জাহান্নাম ভরে ফেলব।’ (সুরা: সোয়াদ, আয়াত ৮৫)

২. খাবারের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা 

রাসুল সা. বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ খাবার খায়, তখন সে যেন বিসমিল্লাহ বলে। যদি সে খাবার গ্রহণের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে যায়, তবে সে যেন পরে বলে, ‘বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু ওয়া আখিরা’ অর্থ: আমি আল্লাহর নামে খাওয়া শুরু করছি প্রথমে এবং শেষে। (মুসলিম, হাদিস ৫০৯৭, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩৭৬৭)

৩. ঘরে প্রবেশের সময় বিসমিল্লাহ বলা

হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার তিনি নবী সা.-কে এরূপ বলতে শোনেন, যখন কোন ব্যক্তি তার ঘরে প্রবেশ করে এবং ভেতরে প্রবেশের সময় ও খাওয়ার সময় বিসমিল্লাহ বলে, তখন শয়তান বলে, এখানে তোমাদের জন্য রাতে থাকার কোন স্থান নেই, আর খানাও নেই।

পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার ঘরে প্রবেশের সময় বিসমি্ল্লাহ বলে না, তখন শয়তান বলে, তোমরা রাতে থাকার স্থান পেয়েছ। এরপর সে ব্যক্তি খাবার সময় যখন বিসমিল্লাহ বলে না, তখন শয়তান (তার সাথীদের) বলে, তোমরা রাতে থাকার স্থান এবং খাবার পেয়ে গেছ। (মুসলিম, হাদিস ২০১৮, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩৭৬৫)

৪. ওয়াশরুমে প্রবেশের আগে দোয়া পড়া

হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন,  জ্বীনদের চোখ ও আদম সন্তানের লজ্জাস্থানের মাঝে পর্দা হল এই যে, কেউ যখন শৌচাগারে প্রবেশ করবে, তখন সে বলবে ‘বিসমিল্লাহ’। (ইবনে মাজাহ হাদিস ২৯৭, বোখারি হাদিস ৪৫১১)

৫. ঘর থেকে বের হওয়ার সময় দোয়া পড়া

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, যখন কোন লোক তার ঘর থেকে বের হয়, তখন তার সাথে দু’জন ফিরিশতা থাকে, যাদেরকে তার জন্য নিযুক্ত করা হয়। অতঃপর যখন সে ‘বিস্‌মিল্লাহ’ বলে তখন তাঁরা (ফিরিশতাদ্বয়) বলেন তোমাকে হিদায়ত দান করা হয়েছে আর যখন সে لاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللَّهِ বলে, তখন তাঁরা বলেন তোমাকে রক্ষা করা হয়েছে। যখন সে تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ বলে, তখন তারা বলেন, তোমার জন্য (আল্লাহ) যথেষ্ট হয়েছে। অতঃপর তার সাথে দু’জন সাক্ষাৎ করে। তখন ফিরিশতাদ্বয় বলেন, এমন লোককে তোমরা কি করতে চাও, যাকে হিদায়াত দান করা হয়েছে, এবং যাকে রক্ষা করা হয়েছে যার জন্য আল্লাহ যথেষ্ট হয়েছেন। (আবু দাউদ হাদিস ৫০৯৫, ইবনে মাজা হাদিস ৩৮৮৬।

৬. নামাজের কাতারের মধ্যখানে ফাঁকা বন্ধ করে দাঁড়ানো 

হযরত ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমরা নামাজের কাতার সোজা করবে, বাহুকে সমপর্যায়ে রাখবে, ফাঁকসমূহ পূর্ণ করবে। মধ্যখানে শয়তানের (জন্য) ফাঁক রাখবে না। যে ব্যক্তি কাতার সোজা করে মিলিয়ে দাঁড়ায় আল্লাহ তাকে (আপন রহমতের সহিত মিলান। আর যে ব্যক্তি কাতার পৃথক করে আল্লাহও তাহাকে (আপন রহমত হইতে) পৃথক করেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৬৬৫, মিশকাত, হাদিস ১১০২)

৭. হাই উঠলে হাত দ্বারা মুখ বন্ধ করা

হাই উঠার সময় মুখে হাত দিয়ে বাধা দিতে হবে। রাসুল (সা.) বলেন, হাই তোলা শয়তানের পক্ষ হতে হয়ে থাকে। কাজেই তোমাদের কারো যখন হাই আসবে তখন তা সাধ্যমত রোধ করবে। হাই তোলার সময় যেন ‘হা’ না হয়, কেননা শয়তান তাতে হাসে (বুখারি হাদিস ৩২৮৯, মিশকাত হাদিস ৯৮৬)। অন্য হাদিসে আছে, রাসুল সা. বলেন, যদি তোমাদের কেউ হাই তোলে তবে সে যেন তার মুখের উপর হাত রেখে তাকে প্রতিহত করে। কেননা এ সময় শয়তান (মুখ দিয়ে) প্রবেশ করে (মুসলিম হাদিস ২৯৯৫, মিশকাত হাদিস ৯৮৫)।

৮. সন্ধ্যার সময় ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করা ও বাচ্চাদের ঘরে রাখা

হজরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যখন রাত ঘনিয়ে আসবে অথবা (বলেছেন) তোমরা সন্ধ্যায় উপনীত হবে, তখন তোমরা তোমাদের ছেলেমেয়েদের আটকে রাখবে। কেননা শয়তান সেসময় চলাফেরা করে। রাত ঘন্টাখানেক অতিক্রান্ত হলে তাদের ছেড়ে দাও। আর দরজাগুলো বন্ধ করবে এবং আল্লাহর নাম স্মরণ করবে। কারণ, শয়তান কোন বন্ধ দুয়ার খোলে না। আর তোমরা নিজেদের মশকসমূহের মুখ এঁটে রাখবে এবং আল্লাহর নাম স্মরণ করবে। আর নিজেদের পাত্রগুলো ঢেকে রাখবে এবং যদি তার ওপর একটি কাঠি রেখেও হয় এবং আল্লাহর নাম স্মরণ করবে। আর তোমাদের বাতিগুলো নিভিয়ে দেবে। (মুসলিম, ৫০৮০, বোখারি ৫১৪৮)

৯. এ দোয়াটি ১০০ বার পড়া

‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইইন কাদির।’

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَىْءٍ قَدِيرٌ (আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই; তিনি একক, তাঁর কোন শরিক নেই; রাজত্ব তাঁরই, যাবতীয় প্রশংসা তাঁরই; তিনিই সবকিছু উপর ক্ষমতাবান)

এই দোয়া যে দিনে একশ বার পাঠ করে সে দশজন গোলাম আযাদ করার সাওয়াব পাবে, তার আমল নামায় একশ নেকী লিপিবদ্ধ করা হবে এবং তার থেকে একশ গোনাহ মুছে দেওয়া হবে। আর তা ঐ দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত শয়তান (তার কুমন্ত্রণা) থেকে তার জন্য রক্ষাকবচ হয়ে যায়। সেদিন সে যা করেছে তার চেয়ে উত্তম পুণ্য সম্পাদনকারী কেউ হবে না। কিন্তু কেউ তার বেশি আমল করলে তার কথা ভিন্ন। (বোখারি, হাদিস ৬৪৩, মুসলিম, হাদিস ৬৫৯৮।

১০. সবসময় আল্লাহর আশ্রয় কামনা করা 

আল্লাহ তায়ালা বলেন, যদি শয়তানের পক্ষ হতে তোমাকে কোনও কুমন্ত্রণা দেওয়া হয়, তবে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (সুরা: আরাফ, আয়াত: ২০০) এ আয়াতে সকল মুসলিমকে শিক্ষা দেয়া হয়েছে, শয়তান আমাদের মনে কখনও মন্দ ভাবনার প্রতি প্ররোচনা দিলে সঙ্গে-সঙ্গে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা উচিত।

পরকালের সফলতা অর্জনের জন্য দুনিয়ার জীবনে শয়তানের বিরুদ্ধে এই আত্মিক সংগ্রাম অব্যাহত রাখা অপরিহার্য। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তাঁর বিধান মেনে চলে এবং নিয়মিত ইবাদতের মাধ্যমে নিজেকে পরিশুদ্ধ রাখে, আল্লাহ তাকে শয়তানের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করেন এবং সঠিক পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখেন।

মুমিনের জীবন মূলত হক ও বাতিলের মধ্যকার এক অবিরাম সংগ্রাম। এই সংগ্রামে শয়তানের প্ররোচনা থেকে নিরাপদ থাকতে হলে ঈমান, তাকওয়া ও নেক আমলের বিকল্প নেই। যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে নিজের সম্পর্ক দৃঢ় করে, শয়তান তার ওপর সহজে প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। তাই প্রতিটি মুসলমানের উচিত আত্মশুদ্ধি ও ইবাদতের মাধ্যমে নিজেকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করা।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো খবর