দক্ষিণ ভারতের চলচ্চিত্রে মহেশ বাবুর নাম মানেই বড় পরিসরের সিনেমা, তারকাসুলভ উপস্থিতি এবং দর্শকের বিপুল প্রত্যাশা। ১৯৭৫ সালের ৯ আগস্ট চেন্নাইয়ে জন্ম নেওয়া এই অভিনেতর আজ ৫১ বছরে পা দিয়েছেন।
অভিনয়জগতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তৈরি হয় শৈশবেই। মাত্র চার বছর বয়সে বাবার প্রযোজনায় নির্মিত ‘নিদ’ সিনেমায় শিশুশিল্পী হিসেবে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান মহেশ। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করে ধীরে ধীরে নিজেকে তৈরি করেন। তাঁর বাবা ঘট্টামানেনি কৃষ্ণাও ছিলেন তেলেগু চলচ্চিত্রের পরিচিত অভিনেতা।
নায়ক হিসেবে মহেশ বাবুর পূর্ণাঙ্গ যাত্রা শুরু হওয়ার পর ‘মুরারি’, ‘অথাডু’, ‘পোকিরি’, ‘দুকুডু’, ‘সীতাম্মা ভাকিট্লো সিরিমাল্লে চেট্টু’, ‘মহর্ষি’ ও ‘সারিলেরু নিক্কেভারু’র মতো সিনেমা তাঁর ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ‘পোকিরি’ তাঁকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয় এবং পরবর্তী সময়ে সিনেমাটি হিন্দিতে ‘ওয়ান্টেড’ নামে পুনর্নির্মিত হয়।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে পুরস্কার ও স্বীকৃতির সংখ্যাও কম নয়। নন্দী অ্যাওয়ার্ড, ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড সাউথসহ বিভিন্ন সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর সংযত ব্যক্তিত্ব ও পর্দায় স্বাভাবিক উপস্থিতির কারণে ভক্তদের কাছে ‘প্রিন্স’ নামেও পরিচিতি পেয়েছেন।
মহেশ বাবুর জনপ্রিয়তা শুধু তেলেগু ভাষাভাষী দর্শকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর অনেক সিনেমা হিন্দিতে ডাব হয়ে টেলিভিশন ও ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যাপক দর্শক পেয়েছে। মাতৃভাষা তেলেগু হলেও ছোটবেলার শিক্ষাজীবন চেন্নাইকেন্দ্রিক হওয়ায় ভাষাটি পড়া ও লেখার ক্ষেত্রে তাঁর সীমাবদ্ধতার কথা বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে। তবে শুনে শুনে সংলাপ আয়ত্ত করে পর্দায় তা সাবলীলভাবে উপস্থাপন করার দক্ষতা তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
অভিনয়ের বাইরে মানবিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত রয়েছেন মহেশ বাবু। শিশুস্বাস্থ্য, চিকিৎসা সহায়তা ও গ্রামীণ উন্নয়নের মতো বিভিন্ন উদ্যোগে তাঁর সম্পৃক্ততার কথা প্রকাশ্যে এসেছে। স্ত্রী নম্রতা শিরোদকারের সঙ্গেও তিনি বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে অংশ নেন।
সিনেমার পাশাপাশি ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন মহেশ। ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন জি. মহেশ বাবু এন্টারটেইনমেন্ট। পরে হায়দরাবাদে এএমবি সিনেমাস নামে একটি প্রিমিয়াম মাল্টিপ্লেক্স ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত হন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাঁর সম্পদের পরিমাণ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব প্রকাশিত হয়েছে; নির্ভুল সরকারি হিসাব না থাকায় এসব সংখ্যাকে আনুমানিক হিসাব হিসেবেই দেখা হয়। কিছু সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে তাঁর সম্পদের পরিমাণ ৩৫০ থেকে ৪০০ কোটি ভারতীয় রুপির মধ্যে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যক্তিজীবন ও ব্যবসার পাশাপাশি বিতর্কও কখনো কখনো তাঁর পিছু নিয়েছে। তেলেঙ্গানার একটি রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হিসেবে তাঁর সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও, ওই প্রতিষ্ঠানের অনিয়মে তাঁর সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। তাই এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ও দায় আলাদা করে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এখন মহেশ বাবুর ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় আকর্ষণ পরিচালক এস এস রাজামৌলির ‘বারানসি’। সিনেমাটিতে মহেশ বাবু রুদ্র চরিত্রে অভিনয় করছেন। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন প্রিয়াঙ্কা চোপড়া ও পৃথ্বীরাজ সুকুমারন। ছবিটির গল্পকে বড় পরিসরের অ্যাকশন-অ্যাডভেঞ্চার হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক লোকেশনে এর নির্মাণ চলছে। জন্মদিন উপলক্ষে নির্মাতারা রুদ্র চরিত্রের নতুন স্থিরচিত্রও প্রকাশ করেছেন।
‘বারানসি’ নিয়ে দর্শকদের আগ্রহের অন্যতম কারণ মহেশ বাবু ও রাজামৌলির প্রথম বড় সহযোগিতা। সিনেমাটির মুক্তির তারিখ ২০২৭ সালের ৭ এপ্রিল নির্ধারিত রয়েছে।
শিশুশিল্পী হিসেবে যে ছোট্ট ছেলেটি চার বছর বয়সে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সেই মহেশ বাবুই পরিণত হয়েছেন তেলেগু চলচ্চিত্রের অন্যতম বড় তারকায়। ৫১তম জন্মদিনে তাঁর ক্যারিয়ারের সামনে এখন নতুন অধ্যায়—রাজামৌলির ‘বারানসি’ সেই যাত্রাকে আরও কতটা বড় করে তোলে, সেটিই দেখার অপেক্ষা।