হাজার হাজার বছর ধরে মানব ইতিহাসের পাতায় যে নামগুলো ধিকৃত ও আলোচিত হয়ে আসছে, তাদের মধ্যে মিশরের ‘ফেরাউন’ অন্যতম। ফেরাউন কোনো একক ব্যক্তির নাম নয়, বরং এটি প্রাচীন মিশরের রাজাদের উপাধি। তবে ইতিহাসে এবং পবিত্র ধর্মগ্রন্থগুলোতে ‘ফেরাউন’ বলতে মূলত মুসা (আ.)-এর সমসাময়িক সেই অহংকারী রাজাকে বোঝানো হয়, যে নিজেকে ঈশ্বর বলে দাবি করেছিল। আজ আমরা ইতিহাসের সেই নিষ্ঠুর শাসক এবং তার অলৌকিক পরিণতির সত্য ঘটনাগুলো তুলে ধরব।
অহংকার ও খোদাদ্রোহিতা
ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, মুসা (আ.)-এর সময়ে মিশরের শাসক ছিলেন দ্বিতীয় রামসেস অথবা তার পুত্র মারনেপ্টাহ। তৎকালীন সময়ে ফেরাউন ছিল বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী এবং ঐশ্বর্যশালী সম্রাট। তার অধীনে ছিল বিশাল সেনাবাহিনী এবং উন্নত স্থাপত্যশৈলী। কিন্তু ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে ফেরাউন নিজেকে ‘আনা রাব্বুকুল আলা’ বা ‘আমিই তোমাদের শ্রেষ্ঠ পালনকর্তা’ বলে ঘোষণা করে। সে বনী ইসরাঈল জাতির ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালাত এবং তাদের নবজাতক পুত্রসন্তানদের হত্যা করত।
মুসা (আ.)-এর দাওয়াত ও অলৌকিক নিদর্শন
আল্লাহর নির্দেশে হযরত মুসা (আ.) ফেরাউনের দরবারে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে যান এবং বনী ইসরাঈলদের মুক্তি দাবি করেন। তিনি ফেরাউনকে সত্যের পথে আসার আহ্বান জানান এবং বেশ কিছু অলৌকিক নিদর্শন প্রদর্শন করেন। কিন্তু ফেরাউন একে জাদু বলে প্রত্যাখ্যান করে। উল্টো সে তার জাদুকরদের দিয়ে মুসা (আ.)-কে পরাজিত করার চেষ্টা করে, কিন্তু মহান আল্লাহর কুদরত ও মুসা (আ.)-এর লাঠির অলৌকিক শক্তির কাছে তারা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়।
লোহিত সাগরে সলিল সমাধি
ফেরাউনের জুলুম যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন আল্লাহর নির্দেশে মুসা (আ.) তার অনুসারীদের নিয়ে রাতের অন্ধকারে মিশর ত্যাগ করেন। সংবাদ পেয়ে ফেরাউন তার বিশাল বাহিনী নিয়ে তাদের পিছু ধাওয়া করে। লোহিত সাগরের তীরে এসে মুসা (আ.) এবং তার জাতি এক কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। সামনে উত্তাল সাগর এবং পেছনে ফেরাউনের রক্তপিপাসু বাহিনী।
ঠিক সেই মুহূর্তে আল্লাহর নির্দেশে মুসা (আ.) সাগরে লাঠি দিয়ে আঘাত করলে ১২টি শুকনো রাস্তার সৃষ্টি হয়। মুসা (আ.) ও তার অনুসারীরা নিরাপদে ওপারে চলে যান। কিন্তু ফেরাউন যখন তার সেনাবাহিনী নিয়ে সাগরের মাঝপথে পৌঁছায়, তখন আল্লাহর আদেশে পাহাড়সম ঢেউগুলো এক হয়ে যায়। নিমিষেই ফেরাউন ও তার বিশাল বাহিনী সলিল সমাধিতে বিলীন হয়ে যায়। ডুবন্ত অবস্থায় ফেরাউন চিৎকার করে ঈমান আনার ঘোষণা দিয়েছিল, কিন্তু মহান আল্লাহ তার সেই তাওবা কবুল করেননি।
বিস্ময়কর প্রত্নতাত্ত্বিক সত্য: সংরক্ষিত দেহ
পবিত্র কুরআনে (সূরা ইউনুস: ৯২) আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছিলেন, “আজ আমি তোমার দেহকে রক্ষা করব যাতে তুমি তোমার পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নিদর্শন হয়ে থাকো।” দীর্ঘ কয়েক হাজার বছর পর ১৮৯৮ সালে মিশরের কিংস ভ্যালি থেকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা ফেরাউনের মমিটি উদ্ধার করেন। বর্তমানে কায়রোর ‘রয়্যাল মামি গ্যালারি’তে এটি সংরক্ষিত আছে।
ফরাসি বিজ্ঞানী ড. মরিস বুকাইলি এই মমি নিয়ে গবেষণা করে স্তম্ভিত হয়ে যান। তিনি দেখেন, ফেরাউনের শরীরে লবণের কণা লেগে আছে, যা প্রমাণ করে সে পানিতে ডুবে মারা গিয়েছিল। অথচ তার শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো হাজার বছর ধরে আশ্চর্যজনকভাবে সংরক্ষিত ছিল। এই সত্য জানার পর ড. মরিস বুকাইলি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
শেষ কথা
ফেরাউনের কাহিনী কেবল একটি গল্প নয়, এটি সমকালীন ও অনাগত বিশ্বের সকল জালেম ও অহংকারী শাসকের জন্য এক মহা শিক্ষা। ইতিহাস প্রমাণ করে যে, মানুষের ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। ফেরাউন চলে গেছে, তার বিশাল সাম্রাজ্য ধুলোয় মিশে গেছে, কিন্তু তার সংরক্ষিত মৃতদেহ আজও বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে—অহংকারের পতন অনিবার্য এবং স্রষ্টার সত্যের জয় সুনিশ্চিত।