রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৫০ অপরাহ্ন
শিরোনাম :

স্বর্ণের বাজারে কেন এমন অস্থিরতা

অর্থনীতি ডেক্স
  • আপডেটের সময় : সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৯২ টাইম ভিউ
স্বর্ণের বাজারে কেন এমন অস্থিরতা

দেশের স্বর্ণবাজারে চলছে চরম অস্থিরতা। রূপকথার গল্পের মতোই একদিনে একাধিকবার দাম বাড়ছে-কমছে। গত শনিবার সকালে ভরিতে ১৬ হাজার টাকা কমানোর পর বিকালেই আবার বাড়ানো হয় স্বর্ণের দাম। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) নির্ধারিত সর্বশেষ দামে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম দাঁড়ায় ২ লাখ ৫৯ হাজার ৬৯৯ টাকা। এরপর আবারও এক দফা দাম বাড়ানো এবং দুই দফা কমানো হয়। সবশেষ সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) নতুন করে নির্ধারিত দামে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ৫১ হাজার ১৮৪ টাকায়।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার দেশের ইতিহাসে স্বর্ণের সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেদিন ভরিপ্রতি ১৬ হাজার ২১৩ টাকা বেড়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। এক বছর আগে একই পরিমাণ স্বর্ণের দাম ছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ভরিপ্রতি দাম বেড়েছে ১ লাখ ৫১ হাজার টাকা। এর সঙ্গে ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ৩ থেকে ৬ শতাংশ মজুরি যোগ করলে বর্তমানে বৈধভাবে ভালো মানের এক ভরি স্বর্ণ কিনতে প্রায় ৩ লাখ টাকা প্রয়োজন হচ্ছে।

নজিরবিহীন এই মূল্যবৃদ্ধিতে স্বর্ণ এখন নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। ফলে ক্রেতা ও বিক্রেতা—উভয় পক্ষই হতাশ। জুয়েলারি দোকানগুলোয় বিক্রি কার্যত বন্ধের মুখে।

বাজুসের ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের বাজারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা দেখা দিলে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে স্বর্ণ কেনায় ঝুঁকেন, ফলে দাম বাড়ে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা, শেয়ারবাজারের অস্থিরতা, বন্ড ও ব্যাংক আমানতের সুদের হার হ্রাস, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান নিয়োগ—সবকিছু মিলিয়ে স্বর্ণের বাজার উত্তাল হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণকে নিরাপদ বিনিয়োগ মনে করছেন। তাদের ধারণা, ইরানে হামলা হলে স্বর্ণের দাম আরও বাড়তে পারে।

বাংলাদেশেও বিশ্ববাজারের প্রভাবের পাশাপাশি ব্যাগেজ রুলে বিদেশ থেকে স্বর্ণ আনার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপের কারণে দাম বেড়েছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির অবস্থা খারাপ হলে স্বর্ণের দাম বাড়ে। বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতি নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে।

তিনি বলেন, ডলারের দাম কমলে স্বর্ণের দাম বাড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বর্তমানে চাপের মধ্যে রয়েছে। বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্ক আরোপের কারণে ডলারের চাহিদা কমেছে, বেড়েছে বাণিজ্য ঘাটতি। এর প্রভাব পড়ছে ডলারে, ফলে স্বর্ণের দাম বাড়ছে।

দেশে মানভেদে চার ধরনের স্বর্ণ বিক্রি হয়। ২২ ক্যারেটে ৯১ দশমিক ৬ শতাংশ, ২১ ক্যারেটে ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ১৮ ক্যারেটে ৭৫ শতাংশ বিশুদ্ধ স্বর্ণ থাকে। পুরোনো অলংকার গলিয়ে তৈরি সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণে বিশুদ্ধতার নির্দিষ্ট মান না থাকলেও ব্যবসায়ীরা জানান, এতে প্রায় ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধ স্বর্ণ পাওয়া যায়।

বাজুসের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের বাজারে প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম পড়বে ২ লাখ ৫১ হাজার ১৮৪ টাকা (যা সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১১টা পর্যন্ত ছিল ২ লাখ ৫৭ হাজার ৭৭৪ টাকা)।

এ ছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৩৯ হাজার ৭৫৪ টাকা (যা সোমবার সকাল ১১টা পর্যন্ত ছিল ২ লাখ ৪৬ হাজার ৫২ টাকা), ১৮ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ৫২০ টাকা (যা সোমবার সকাল ১১টা পর্যন্ত ছিল ২ লাখ ১০ হাজার ৮৮৫ টাকা) এবং সনাতন পদ্ধতিতে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ১৯৫ টাকা (যা সোমবার সকাল ১১টা পর্যন্ত ছিল ১ লাখ ৭২ হাজার ৫৬৯ টাকা)। পরবর্তী সিদ্ধান্ত না জানানো পর্যন্ত সব জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে এ দাম কার্যকর থাকবে।

২০২৩ সালের ২১ জুন দেশে স্বর্ণের দাম ১ লাখ টাকা ছাড়ায়। এরপর ধারাবাহিকভাবে দাম বাড়তেই থাকে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দাম বৃদ্ধির কারণে স্বর্ণের ক্রেতা কমে গেছে। বরং যাদের কাছে স্বর্ণ মজুদ আছে, তারা অনেকে বিক্রি করছেন। এদিকে দুবাইয়ের বাজারে বৃহস্পতিবার ২২ ক্যারেটের প্রতি গ্রাম স্বর্ণের দাম ছিল ১৫৬ ডলার। ডলারপ্রতি ১২৩ টাকা হিসাবে প্রতি ভরি পড়ে প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার টাকা। বাংলাদেশের বাজারের সঙ্গে পার্থক্য দাঁড়ায় ভরিতে ৩৫ হাজার টাকার বেশি।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসিসহ বিভিন্ন সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়েও সাম্প্রতিক দামের ওঠানামা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প ফেড চেয়ারম্যান হিসেবে কেভিন ওয়ারশকে চূড়ান্ত করায় বিনিয়োগকারীরা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন। ফলে স্বর্ণ থেকে আংশিকভাবে ডলারের দিকে ঝুঁকছেন তারা, যার প্রভাব পড়েছে দামে।

বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির সাবেক সহসভাপতি ও অলংকার নিকেতনের মালিক এমএ হান্নান আজাদ বলেন, বিশ্বযুদ্ধ, অস্থিরতা বা অশান্তি শুরু হলেই স্বর্ণের দাম বাড়ে। ইরানে হামলার আশঙ্কায় সম্প্রতি দাম বেড়েছিল। পরে আলোচনার ইঙ্গিতে কিছুটা কমেছে। তবে বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণ মজুত করছেন। ব্যবহারিক প্রয়োজনে মানুষ স্বর্ণ কিনছেন না।

তিনি বলেন, দেশের স্বর্ণবাজার ভয়াবহ সংকটে। দাম বেশি, অন্য পণ্যের দামও চড়া, মানুষের হাতে টাকা নেই। ফলে বেচাকেনা নেই বললেই চলে। বাজুসের প্রায় ৪০ হাজার সদস্যের অনেকেই ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন।

রমজান ও ঈদ স্বর্ণ ব্যবসার বড় মৌসুম হলেও বায়তুল মোকাররমসহ বড় বাজারগুলোয় এখন ক্রেতার দেখা নেই। বড় দোকানে দু-একজন এলেও ছোট দোকানগুলো পুরোপুরি ফাঁকা।

দেশে বছরে স্বর্ণের চাহিদা প্রায় ২১ টন। কিন্তু বৈধ আমদানি খুবই কম। ফলে চোরাচালানের ওপর নির্ভরতা বেশি। উচ্চ দামের কারণে ক্রেতারা এখন সিটি গোল্ড ও গোল্ড প্লেটেড অলংকারের দিকে ঝুঁকছেন। মধ্যবিত্তের বড় একটি অংশ স্বর্ণের বিকল্প হিসেবেই এসব পণ্য কিনছেন।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো খবর