রাঙ্গুনিয়ার বন্দাররাজা পাড়ায় বাড়ির উঠানে রাখা চার খাটিয়ায় চার সহোদরের মরদেহ। মানুষের স্রোত ঠেকানো দায়, সবার ইচ্ছে শেষবারের মত এক নজর দেখবে চার ভাইকে।
কোরবানির ঈদ করতে বাড়িতে আসার কথা ছিল ছোট দুই ভাইয়ের। ঈদের পর তাদের বিয়েরও প্রস্তুতি চলছিল। তবে দুজন নয়, একসাথে ফিরলেন চারজনই, কিন্তু নিথর দেহে।বুধবার ভোরে ওমান প্রবাসী চার ভাই রাশেদুল ইসলাম, সাহেদুল ইসলাম, মো. সিরাজ ও মো. শহিদের মরদেহ চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বন্দাররাজা পাড়ায় পৌঁছানোর পর দেখা গেছে এমন দৃশ্য।
এর আগে মঙ্গলবার রাতে তাদের মরদেহ ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আনা হয়; এরপর এদিন ভোরে চার জনের মরদেহ ফ্রিজার অ্যাম্বুলেন্সে করে গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলার নানা প্রান্ত থেকে হাজারো নারী, পুরুষ ও শিশু জড়ো হন বাড়ির সামনে। তবে কেবল রাঙ্গুনিয়া নয় উত্তর চট্টগ্রামের রাউজান, ফটিকছড়ি, বোয়ালখালী, হাটহাজারী ও সীতাকুণ্ডসহ বিভিন্ন উপজেলা থেকে মানুষ আসে বন্দাররাজা পাড়ার ওই বাড়িতে। মানুষের কান্না আর স্বজনের বিলাপে ভারি হয়ে ওঠে সেখানকার পরিবেশ।
মা খাদিজা বেগমকে এতদিন জানানো হয়নি যে তার চার ছেলে বেঁচে নেই। কিন্তু বুধবার সকালে তিনি জানতে পারেন সেই নির্মম সত্যটি। এরপর বারবার মুর্ছা যাচ্ছিলেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা ও চিকিৎসক কাজী মনসুর আহমেদ উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, খাদিজা বেগমের কাছে গত এক সপ্তাহ ধরে যে সত্যটি আড়াল করে রাখা হয়েছিল, তা আজকে আর চাপা থাকেনি।
“এখন তিনি শয্যাশায়ী।”
সকাল বেলা সাড়ে ১০টার দিকে রাঙ্গুনিয়ার লালানগর উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে চার ভাইয়ের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় জানাজার জন্য। সেই শেষ যাত্রায় শামিল হয় কয়েক হাজার মানুষ।
জানাজায় অংশ নিতে আসা মানুষের ভিড়ে বিদ্যালয়ের মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। বেলা ১১টায় হওয়া জানাজার নামাজ পরিচালনা করেন খাদিজা বেগমের একমাত্র জীবিত সন্তান মোহাম্মদ এনাম। চার ভাইকে হারিয়ে বিপর্যস্ত এনাম জানাজার শেষে মোনাজাতে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
রাঙ্গুনিয়ার মরিয়ম নগর থেকে জানাজায় অংশ নিতে আসা শফিকুল ইসলাম বলেন, “এরকম ঘটনা রাঙ্গুনিয়ার মানুষ আর দেখেনি। চার ভাইয়ের মৃত্যুতে পুরো রাঙ্গুনিয়ার মানুষ শোকাহত। যারা নিহত হয়েছেন তাদের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করছি। পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে ও জানাজায় অংশ নিতে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়েছে।”
জানাজায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী, প্রশাসন, পুলিশ ও বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ অংশ নেয়। জানাজার পর বাড়ি থেকে ৩০০ গজ দূরে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়েছে।
চার ভাইয়ের মধ্যে সিরাজ ও শহিদ অবিবাহিত, ১৫ মে তাদের দেশে ফেরার কথা ছিল। দেশে আসার প্রস্তুতিতে কেনাকাটার জন্য গত বুধবার চার ভাই ওমানের বারকা এলাকা থেকে মুলাদাহর উদ্দেশে একসঙ্গে বের হয়েছিলেন।
রাত ৮টার পর তাদের একজন এক আত্মীয়কে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে অসুস্থতার কথা জানান। নিজেদের লোকেশন পাঠিয়ে বলেন, গাড়ি থেকে বের হওয়ার মত অবস্থাও তাদের নেই।
পরে মুলাদাহ এলাকায় একটি ক্লিনিকের সামনে পার্ক করা গাড়ির ভেতরে চারজনকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে গাড়ির দরজা খুলে তাদের মরদেহ উদ্ধার করে।
এর দুদিন পর রয়্যাল ওমান পুলিশের বরাত দিয়ে টাইমস অব ওমানে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, দক্ষিণ আল বাতিনা গভর্নরেট পুলিশের নেতৃত্ব আল-মাসনা গভর্নরেট এলাকায় বুধবার রাতে একটি গাড়ির ভেতর থেকে ওই চারজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ বলছে, গাড়ি চালু থাকা অবস্থায় এটির এক্সজস্ট থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে শ্বাসগ্রহণের ফলে ওই চারজনের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।