জুলাই আন্দোলনের সময়কার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই দিন কামরুল ইসলামের চিকিৎসার নথিপত্রে ‘প্রতারণা’ ও ‘চরম অসঙ্গতির’ অভিযোগ তুলে তাকে হাসপাতাল থেকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ চেয়েছে প্রসিকিউশন।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এ আদেশ দেয়।শুনানি শেষে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, কামরুল ইসলামের চিকিৎসাসংক্রান্ত নথিতে চরম অসঙ্গতি রয়েছে এবং ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে ‘ফ্রড’ বা প্রতারণা করে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসার আদেশ নেওয়া হয়েছিল। আসামি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (পিজি হাসপাতাল) থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে চেয়ে একটি আবেদন করেছিলেন এবং ট্রাইব্যুনাল অনুমতিও দিয়েছিল। কিন্তু এভারকেয়ার হাসপাতালে কোনো প্রিজন সেল নেই। এছাড়া আসামিপক্ষ যেসব মেডিকেল পেপার দাখিল করেছে, তাতে যথেষ্ট সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে।
সন্দেহের কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, আসামি ২০২৪ সালের ১৮ নভেম্বর থেকে জেলহাজতে রয়েছেন। অথচ আসামিপক্ষ চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি একটি ‘কেস সামারি’ দাখিল করেছে। জেলে থাকা অবস্থায় তিনি বাইরে গিয়ে কীভাবে ডাক্তারের কাছে গেলেন? এছাড়া ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি আরেকটি স্বাস্থ্য প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে, যা সিঙ্গাপুর থেকে আনা বলে দাবি করা হয়। জেলহাজতে থাকা অবস্থায় এই মেডিকেল পেপারগুলো কী করে তৈরি হলো, তা আমাদের কাছে চরম সন্দেহজনক মনে হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ১৫ ফেব্রুয়ারির কাগজে কামরাঙ্গীরচরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ডাক্তারের নাম রয়েছে এবং সেখানে ‘গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সার’ নামক অদ্ভুত একটি রোগের কথা লেখা আছে। অথচ জেল কর্তৃপক্ষ রিপোর্ট দিয়েছে যে তিনি বর্তমানে শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন।
অসঙ্গতিগুলো ট্রাইব্যুনালের নজরে আনার পর আদালত এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসার আদেশটি বাতিল করে দেয়। পাশাপাশি এসব কাগজপত্র কীভাবে সংগ্রহ করা হলো, তার ব্যাখ্যা দিতে কামরুলের আইনজীবীদের ১৫ দিনের সময় দিয়ে শোকজ করেছে ট্রাইব্যুনাল।
প্রধান কৌঁসুলি বলেন, এ বিষয়ে তদন্ত চলছে এবং এর পেছনে কোনো প্রতারণা থাকলে ট্রাইব্যুনাল কঠোর ব্যবস্থা নেবে। এর ফলে কামরুল ইসলামের চিকিৎসা আপাতত পিজি হাসপাতালেই চলবে।
প্রসিকিউশনের তোলা জালিয়াতির অভিযোগ নাকচ করে আসামিপক্ষের আইনজীবী আফতাব মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে কোনো ভুয়া কাগজ দেওয়ার সুযোগ নেই। সব মেডিকেল সার্টিফিকেটে থাকা চিকিৎসকের বিএমডিসি নম্বর অনলাইনে সার্চ দিলেই পাওয়া যাবে। এগুলো সঠিক কি না, তা প্রমাণের জন্যই আদালত আমাদের ১৫ দিন সময় দিয়েছে।
সিঙ্গাপুরের রিপোর্টের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে এই আইনজীবী বলেন, নিম্ন আদালতে আমরা একটা আবেদন দিয়েছিলাম যে, উনার কিছু চিকিৎসা বা টেস্ট বাংলাদেশে সম্ভব নয়, সেগুলো আমরা নিজ খরচে সিঙ্গাপুর থেকে করিয়ে আনব। আদালত সেটি মঞ্জুর করে আমাদের পিটিশনসহ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। তার দাবি, জেল কর্তৃপক্ষ আসামিকে স্যাম্পল সংগ্রহের জন্য হাসপাতালে পাঠায় এবং সেখান থেকে যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নমুনা সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়।
প্রসিকিউশনের ‘ভুয়া কাগজপত্রের’ অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আজ যে কেস হিস্ট্রিটা দেওয়া হয়েছে, সেটা কোনো মেডিকেল রিপোর্ট নয়; উনার কী কী সমস্যা রয়েছে, তার একটি হিস্ট্রি মাত্র। যেহেতু তিনি জেল কর্তৃপক্ষের অধীন, তাই ব্যক্তিগতভাবে আমাদের চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ নেই। উনার ছেলেও একজন চিকিৎসক। মূলত ছেলের সঙ্গে পরামর্শ করেই এই কেস সামারি দেওয়া হয়েছে।
আদেশ বাতিলের বিষয়ে তিনি বলেন, উপযুক্ত চিকিৎসার সরঞ্জাম না থাকায় আমরা এভারকেয়ারে চিকিৎসার আবেদন করেছিলাম। আদালত শুনানি শেষে আদেশের জন্য রেখেছিল। গত রোববার আমরা এভারকেয়ারে নেওয়ার আদেশের কপি পাই। কিন্তু প্রসিকিউশন এই আদেশের বিরুদ্ধে পিটিশন দেওয়ায় আজ সেটির শুনানি হয় এবং এভারকেয়ারে নেওয়ার আগের আদেশটি রিকল (প্রত্যাহার) করা হয়।
আইনজীবী আফতাব মাহমুদ আরও বলেন, প্রসিকিউশন আদালতকে বলেছিল, ফেক পেপারস এসেছে বলে তারা ধারণা করছে, তাই উনাকে কারাগারে পাঠানো হোক। কিন্তু আমাদের সাবমিশন ছিল, উনি ট্রিটমেন্টে আছেন এবং কাগজপত্রগুলো কোন চ্যানেল হয়ে এসেছে তা প্রমাণের জন্য আমরা সময় চাই। আদালত আমাদের ১৫ দিন সময় দিয়েছে। বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কামরুলকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয় এবং বিচার শুরুর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।