নেতারা আসেন পরে, আন্দোলন শুরু করে জনতা, বাংলাদেশের জনগণের অদম্য শক্তি: নেতার অপেক্ষায় নয়, ইতিহাস গড়ে তুলেছে জনতাই বাংলাদেশ কোনো জাতীয় নেতার অপেক্ষায় থাকেনি। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর তিন দিন এদেশে কোনো সরকার ছিল না।
এই একটি বাক্যে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের পুরো রাজনৈতিক ইতিহাসের সারকথা। এদেশ কখনো কোনো একক নেতার নির্দেশের অপেক্ষায় বসে থাকেনি। যখনই স্বাধীনতা, অধিকার কিংবা গণতন্ত্রের প্রশ্ন এসেছে, তখনই রাস্তায় নেমে এসেছে সাধারণ মানুষ। ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, নারী—সবাই মিলে গড়ে তুলেছে ইতিহাস। নেতা এসেছে পরে। জনতা আগে।
১৯৪৭: দেশভাগ ও পূর্ববাংলার জাগরণ
দেশভাগের সময় পূর্ববাংলার মানুষ কোনো একক নেতার নেতৃত্বে রাস্তায় নামেনি। ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হলেও ভাষা, সংস্কৃতি আর অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ ধীরে ধীরে জমতে শুরু করেছিল। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল সাধারণ নাগরিকদের মধ্য থেকেই। সেই বীজ পরবর্তী আন্দোলনগুলোর ভিত্তি তৈরি করে।
১৯৫২: ভাষা আন্দোলন জনতার প্রথম বড় বিজয়
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। পুলিশের গুলিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার শহীদ হলেন। কিন্তু এই আন্দোলন কোনো একক নেতার নেতৃত্বে হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা, সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক কর্মীরা একসঙ্গে রাস্তায় নেমেছিলেন। ফলে বাংলা ভাষা পেল তার মর্যাদা। এটাই প্রথমবার প্রমাণিত হলো, বাংলাদেশের মানুষ নেতার অপেক্ষায় থাকে না, নিজেরাই নেতৃত্ব দেয়।
১৯৭১: মুক্তিযুদ্ধ জনযুদ্ধের অতুলনীয় উদাহরণ
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে ৯ মাসের যুদ্ধ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ ছিল অনুপ্রেরণা, কিন্তু যুদ্ধটা লড়েছিল কোটি কোটি সাধারণ মানুষ। গ্রামের কৃষক, ছাত্র, শিক্ষক, নারী সবাই মিলে গেরিলা যুদ্ধ করেছেন। মুক্তিবাহিনী গড়ে উঠেছিল জনতার মধ্য থেকে। কোনো একক নেতার অপেক্ষায় বসে থাকেনি দেশ। ফলে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় এসেছিল জনতার ঐক্যের কারণেই।
১৯৯০: গণঅভ্যুত্থান স্বৈরাচারের পতন
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ১৯৯০ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর। ছাত্রদের আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে সাধারণ মানুষের ঢল নেমেছিল রাস্তায়। বিএনপি, আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দল পরে যোগ দিলেও প্রথম ধাক্কাটা দিয়েছিল জনতা। ৬ ডিসেম্বর এরশাদের পতন হয়। আবারও প্রমাণিত হলো নেতারা আসেন পরে, আন্দোলন শুরু করে জনতা।
২০২৪: নতুন প্রজন্মের গণঅভ্যুত্থান-ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
সম্প্রতি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে সরকারবিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ৫ আগস্ট থেকে প্রায় তিন দিন এদেশে কোনো সরকার ছিল না। কোনো নেতা বা সেনাবাহিনী বা রাজনৈতিক দলের নির্দেশের অপেক্ষায় বসে থাকেনি জনতা। ছাত্র-যুবকরাই রাস্তায় শৃঙ্খলা রক্ষা করেছে, দেশ চালিয়েছে। পরে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে। আবারও দেখা গেল—বাংলাদেশের মানুষ নেতার জন্য অপেক্ষা করে না। তারা নিজেরাই ইতিহাস তৈরি করে।
উপসংহার: জনতাই এদেশের আসল নেতা
বাংলাদেশের প্রতিটি বড় পরিবর্তন এসেছে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে। নেতারা হয়তো অনুপ্রেরণা দিয়েছেন, কিন্তু আসল শক্তি এসেছে রাস্তার মানুষের কাছ থেকে। ১৯৪৭ থেকে ২০২৪—প্রতিবারই দেখা গেছে, যখন প্রয়োজন হয়, বাংলাদেশের জনতা এক হয়ে উঠে। কোনো নেতার অপেক্ষায় বসে থাকে না।
এই দেশের ইতিহাস শেখায়—গণতন্ত্র কখনো উপর থেকে আসে না, তা গড়ে ওঠে নিচ থেকে, জনতার হাতে। আর তাই বাংলাদেশ আজও অপেক্ষায় নেই। সে নিজেই তার ভাগ্য নির্ধারণ করে।