একসময় দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের জন্য সংগ্রাম করতে হতো ১৫-১৬ সদস্যের একটি পরিবারকে। জীবনধারণের একমাত্র অবলম্বন ছিল গরুর ভুঁড়ি বা বট বিক্রি। থাকতেন বস্তির ভাঙা বেড়ার ঘরে। সেই চিত্র এখন সম্পূর্ণ অতীত। আজ সেই পরিবারটিই বিলাসবহুল প্রাসাদে বাস করে, চলাফেরা করে দামী গাড়িতে। তাদের এই জাদুকরী উত্থানের পেছনে নেই কোনো আলাদিনের চেরাগ, বরং রয়েছে মাদকের এক অন্ধকার জগত। বলছি রাজধানীর পল্লবীর বহুল আলোচিত ‘মাদক সম্রাজ্ঞী’ শাহজাদী ও তার পারিবারিক সিন্ডিকেটের কথা।
বিলাসবহুল জীবন ও অন্ধকার উৎস
শাহজাদীর বর্তমান জীবনযাপন দেখলে বোঝার উপায় নেই যে, একসময় তিনি ২০০ টাকার জামা পরে দিন কাটিয়েছেন। এখন তিনি ঘুমান লাখ টাকা দামের খাটে, পরেন দামী অলংকার। প্রতি বছর কোরবানি ঈদে খরচ করেন প্রায় ১১ লাখ টাকা। দু’হাত ভরে টাকা বিলান সাধারণ মানুষকে। তবে এই অঢেল সম্পদের উৎস পল্লবী ও মিরপুর এলাকার রমরমা মাদক ব্যবসা। এলাকাবাসীর মতে, বস্তির অন্ধকার থেকে উঠে আসা শাহজাদী এখন কোটি কোটি টাকার মালিক, যা তিনি উপার্জন করেছেন যুবসমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ে।
পারিবারিক সিন্ডিকেট ও মাদকের সাম্রাজ্য
অনুসন্ধানে জানা যায়, পল্লবীতে মাদক ব্যবসার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ এখন শাহজাদীর হাতে। আর এই ব্যবসায় তাকে সঙ্গ দিচ্ছে তার পুরো পরিবার। শাহজাদীর স্বামী রনি, একমাত্র মেয়ে মুসকান ও জামাই সুজন এই ব্যবসার অন্যতম সহযোগী। এছাড়া তার পাঁচ ভাই বট আসলাম, ইসলাম, কালাম, মনু, সনু এবং পাঁচ বোন শাহাজাদী, বেলি, কলি, কাজল ও গোলাপ প্রত্যেকেই এই সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্য।
শাহজাদীর বড় ভাই ‘বট আসলাম’ ও তার পরিবার বেগুনটিলা সরকারি আবাসন ও কামাল মজুমদার ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় মাদকের অভয়ারণ্য গড়ে তুলেছেন। অন্যদিকে, শাহজাদী ও তার স্বামী পূর্ব কুর্মিটোলা ক্যাম্প ও নতুন রাস্তা সংলগ্ন এলাকায় ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন। জিসান, রাজন, রিফাত, রাজসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের মাধ্যমে তারা গড়ে তুলেছেন শক্তিশালী মাদক নেটওয়ার্ক।
প্রশাসনের নাকের ডগাতেই কারবার সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, পল্লবী থানা থেকে মাত্র ৩০০ গজ দূরেই শাহজাদী ও তার পরিবারের মাদক ব্যবসা চলছে প্রকাশ্যে। অভিযোগ রয়েছে, থানা সংলগ্ন এলাকাতেই গাঁজা, ইয়াবা, হেরোইন ও বিভিন্ন নেশাজাতীয় ট্যাবলেটের পসরা সাজিয়ে বসেন তারা। ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চলে বেচাকেনা। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদক কারবারের পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডেও জড়িত এই পরিবার। তাদের নিজস্ব কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসী বাহিনী থাকায় ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পান না।
ধরাছোঁয়ার বাইরে শাহজাদী
শাহজাদীর বিরুদ্ধে পল্লবী থানায় একাধিক মামলা থাকলেও তিনি বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, শাহজাদীর রয়েছে ৩০ জনেরও বেশি নিজস্ব ‘সোর্স’। পুলিশের অভিযানের খবর আগেই তার কাছে পৌঁছে যায়, ফলে তিনি সহজেই পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এছাড়া এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্যের সাথে যোগসাজশ করেই দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে আসছেন শাহজাদী। ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর মাদক কারবারিরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশের বক্তব্য
এ বিষয়ে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। শাহজাদী ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো আমরা গুরুত্ব সহকারে দেখছি। তাদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে একাধিক মামলা রয়েছে এবং গ্রেপ্তারের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে যদি মাদক কারবারিদের সাথে যোগসাজশের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
শাহজাদীর এই অভাবনীয় উত্থান কেবল একটি পরিবারের ধনাঢ্য হওয়ার গল্প নয়, বরং এটি সমাজের অবক্ষয়ের এক করুণ চিত্র। মাদকের এই ভয়াবহ বিস্তার রোধে এবং শাহজাদী সিন্ডিকেটের লাগাম টানতে প্রশাসনের কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় পল্লবীবাসী। চলবে,,,,,,