নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য’র অনুকূলে ঐচ্ছিক তহবিল অনুদানের প্রকাশিত তালিকায় সংসদ সদস্যের মেয়েসহ তারই নিকটাত্মীয়দের নাম থাকায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এরপর দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ এনে ব্যক্তিগত সহকারীকে বরখাস্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়েত ইসলামী দলের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে সংসদ সদস্য ও নড়াইল জেলা জামায়েতের আমির মো. আতাউর রহমানকে।
রোববার (২৮ জুন) দুপুরে জাতীয় সংসদের প্যাডে নড়াইল -২ আসনের সংসদ সদস্য মো. আতাউর রহমান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে তারই ব্যক্তিগত সহকারী আবু সালেহ মোহাম্মদ গোফরানকে দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ এনে বরখাস্ত করা হয়। আর অনুলিপি পাঠানো হয় জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব, জেলা প্রশাসক নড়াইল, উপজেলা নির্বাহী অফিসার নড়াইল সদর ও লোহাগড়া এবং প্রেসক্লাব নড়াইল বরাবর। এমপি স্বাক্ষরিত চিঠিটি তার ভেরিফাইড ফেসবুক পেইজ থেকেও পোস্ট করা হয়।
অন্যদিকে একই দিনে বাংলাদেশ জামায়েত ইসলামীর এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জানিয়েছেন, সম্প্রতি সংঘটিত একটি অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় সংসদের নড়াইল-২ আসনের বিরোধী দলের মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব আতাউর রহমান বাচ্চুকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে।জানা যায়, চলতি মাসের ১৪ জুন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের অর্থ শাখা -২ এর সিনিয়র সহকারী সচিব রাখী আহমেদ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জানা যায়, নড়াইল -২ আসনের সংসদ সদস্য মো. আতাউর রহমানের অনুকূলে নিজ কর্তৃত্বে বণ্টনের জন্য ২০০২৫-২৬ অর্থ বছরের বরাদ্দকৃত ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫০০ টাকা বণ্টনের মঞ্জুরি দেয়া হয়।
যা সংসদ সদস্যের দেয়া নামীয় তালিকার ২১ জনের অনুকূলে বণ্টনের কথা বলা হয় চিঠিতে। ওই চিঠির ১ ও ৮ নং ক্রমিকে ফাইজা নাম ব্যবহার করে বাবার নাম দেখানো হয় যথাক্রমে মো. বাচ্চু এবং মো. আতাউর। আর ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয় নড়াইল সদরের হবোখালী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ড। একই তালিকায় দুই ক্রমিকে ফাইজা নামের বিপরীতে ১০ হাজার করে মোট ২০ হাজার টাকা বরাদ্দের অনুমোদন চাওয়া হয়।সংসদ সদস্যের অনুমোদন পাওয়া চিঠিতে, নড়াইল সদর উপজেলার ১০ জনের মধ্যে মোট ৮০ হাজার টাকা এবং লোহাগড়া উপজেলার ১১ জনের মধ্যে ১ লাখ ৩ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দের অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
অভিযোগ ওঠে, সরকারি বরাদ্দের তালিকায় ১ ও ৮ নং ক্রমিকের ‘ফাইজা’ নামটি খোদ এমপি আতাউর রহমানের মেয়ের। একই তালিকার ১১ ও ১৭ নং তালিকায় থাকা ‘লাবিবা ও নুসাইবা’ নাম দুইটি সংসদ সদস্যের ‘শ্যালকের’ মেয়েদের নাম এবং তালিকার ১২ নম্বরে থাকা আলী আহসান নামটি ও এমপির শ্যালকের।
শুক্রবার (২৬ জুন) নড়াইল -২ আসনের সংসদ সদস্য মো. আতাউর রহমানের ঐচ্ছিক তহবিল অনুদানের মঞ্জুরিকৃত চিঠিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তালিকায় সংসদ সদস্যের মেয়েসহ নিকটাত্মীয়দের নাম থাকায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সহ বিভিন্ন মহলে শুরু হয় সমালোচনা।
বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বিষয়টি স্পষ্ট ব্যাখ্যা করে সংসদ সদস্য মো. আতাউর রহমান বলেন, একজন সংসদ সদস্যদের বার্ষিক ঐচ্ছিক তহবিলে ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। আমি এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর এই অর্থ বছরের বাকি সময়ের জন্য আমাকে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এই টাকা নেয়ার জন্য সংসদ সচিবালয়ে নামের তালিকা আগেই জমা দিতে হয়। এলাকায় ব্যস্ত থাকার মধ্যে ব্যক্তিগত সহকারী ফোনে জানায়, আজকের দিনের মধ্যে নামের তালিকাসহ ডিও জমা দিতে হবে। আমি তাকে বলি, তুমি সব ইউনিয়ন থেকে তালিকা সংগ্রহ করে জমা দাও।
সে জানায়, অফিস থেকে বলেছে এখন কিছু পরিচিত নাম দিয়ে এটা তুলে নিতে হবে, পরে বিভিন্ন সময়ে বিতরণ করে প্রকৃত তালিকা আপনারা সংরক্ষণ করতে পারবেন। তখন ব্যক্তিগত সহকারীর কাছে থাকা আমার স্বাক্ষরিত প্যাডে ওই তালিকা টা অফিসে জমা দিয়েছে। তালিকায় আমার এলাকার লোক বা আমার পরিবারের সদস্যদের নামও দিয়েছে। তালিকায় কাদের নাম দিয়েছে আমি তখন দেখার সুযোগও পাইনি।’
তালিকায় আপনার পরিবারের সদস্যের নাম এটা কি সঠিক, এমন প্রশ্নের জবাবে এমপি আতাউর রহমান বলেন, তালিকাটা ফেসবুকে দেখার পর ব্যক্তিগত সহকারীকে প্রশ্ন করেছিলাম আমার মেয়ের নাম কেন দিছো, সে উত্তরে জানিয়েছিল, প্রাথমিক তালিকায় কোনো অসহায় দরিদ্রের নাম যাচাই-বাছাই ছাড়া দিয়ে পরে তাকে না দেয়া হলে সে ব্যক্তি এটা নিয়ে কথা ছড়াবে নাম দেয়া হলেও টাকা পাইনি। সে কারণেই আপনার পরিবারের সদস্যদের নাম দেয়া হয়েছে। আমি জানতাম না বরাদ্দের টাকাটা এসেছে কি না? ফেসবুকে বিষয়টি বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে ছড়িয়ে দেয়ার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানতে পারি টাকাটা এসেছে।’
প্রাথমিক তালিকা অনুযায়ী নয়, অনুদান পাবার যোগ্য এমন ব্যক্তিদের তালিকা করেই বরাদ্দকৃত টাকা দেয়া হবে আশ্বস্ত করেন নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. আতাউর রহমান।
এ ব্যাপারে নড়াইল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) টি. এম রাহসিন কবির বলেন, ‘এমপির ডিও লেটার অনুযায়ী দেওয়া তালিকায় থাকা নামে এই অনুদান সচিবালয় থেকে অনুমোদিত হয়ে আসে। নীতিমালা অনুযায়ী, ‘সচিবালয় থেকে যাদের নামে বরাদ্দ হয়ে এসেছে, তাদেরকেই দিতে হবে। এর বাইরে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এরমধ্যে যাদি কেউ না আসে, তার টাকা ফেরত যাবে।’ কিন্তু এখান থেকে নতুন তালিকায় দেওয়ার সুযোগ নেই। যদি তালিকা সংশোধন করতে হয়, তাহলে সচিবলায় থেকেই করে আনতে হবে।’