: সাংবাদিকতাকে রাষ্ট্রীয় নিবন্ধন বা লাইসেন্সের আওতায় আনার সাম্প্রতিক উদ্যোগ দেশের মুক্ত গণমাধ্যমকে সরাসরি সরকারের অধীনস্থ করে তোলার একটি বিপজ্জনক পদক্ষেপ। কেউ কেউ এটিকে বার কাউন্সিলের মতো পরীক্ষা দিয়ে এডভোকেটশিপ দেওয়ার মতো ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করছেন। সাংবাদিক সমাজ, মানবাধিকার সংগঠন ও গণতন্ত্রপন্থীরা এই ধরনের উদ্যোগকে গণমাধ্যমের মুখ চেপে ধরার সুনিপুণ ফাঁদ হিসেবে দেখছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবস্থা চালু হলে স্বাধীন সাংবাদিকতা আর থাকবে না — পুরো গণমাধ্যম হয়ে উঠবে সরকারি নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার।
বার কাউন্সিলের মতো পরীক্ষা-নির্ভর নিবন্ধন: একটি বিপজ্জনক প্রস্তাব
আইনজীবীদের ক্ষেত্রে বার কাউন্সিলের পরীক্ষা যৌক্তিক কারণ আইন একটি নিয়ন্ত্রিত পেশা এবং আদালতে উপস্থাপনার সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু সাংবাদিকতা সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। এটি কোনো পেশাগত লাইসেন্সের বিষয় নয়, বরং মৌলিক অধিকারের প্রকাশ।
বার কাউন্সিলের মতো পরীক্ষা চালু করলে:
° সরকার বা সরকার-নিয়ন্ত্রিত বোর্ড প্রশ্নপত্র তৈরি করে “যোগ্য” সাংবাদিক নির্বাচন করবে, যা সরাসরি সেন্সরশিপের দরজা খুলে দেবে।
° সমালোচনামূলক, অনুসন্ধানী ও সরকার-বিরোধী কণ্ঠস্বরকে পরীক্ষায় “অনুপযুক্ত” ঘোষণা করে বাদ দেওয়া সহজ হয়ে যাবে।
° সাংবাদিকতার সৃজনশীলতা, সাহস ও নৈতিকতা কোনো একক পরীক্ষায় মাপা সম্ভব নয়। এটি শুধু আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হবে।
নিবন্ধন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আইনি ও নৈতিক ভিত্তি সাংবাদিকতা কোনো সরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত পেশা নয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে বলেছে:
“চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক্ ও ব্যক্তির স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হইবে।”
আন্তর্জাতিকভাবে:
° জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা (UDHR) অনুচ্ছেদ ১৯
° নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICCPR) অনুচ্ছেদ ১৯ (বাংলাদেশ অনুসমর্থক)
° ইউনেস্কোর মিডিয়া ফ্রিডম নীতি
এসব আইন স্পষ্ট করে যে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় পূর্বানুমোদন বা লাইসেন্সিং গ্রহণযোগ্য নয়। প্রেস কাউন্সিল আইন ১৯৭৪ ও তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ ইতোমধ্যে স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য যথেষ্ট কাঠামো দেয়।
বাস্তব ঝুঁকি ও সপক্ষের যুক্তির দুর্বলতা
নিবন্ধন বা বার কাউন্সিল-স্টাইল পরীক্ষা চালু হলে সুবিধাবাদী গোষ্ঠী লাভবান হবে, আর সৎ সাংবাদিকরা বঞ্চিত হবেন। হলুদ সাংবাদিকতা, সুরক্ষা বা জবাবদিহিতার অজুহাত একেবারেই ভিত্তিহীন। বিদ্যমান আইন (মানহানি, দণ্ডবিধি ইত্যাদি) দিয়েই এসব নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
নিবন্ধনবিহীন মুক্ত সাংবাদিকতার আইনি ভিত্তি ও বিকল্প
সাংবাদিকরা নিবন্ধন বা পরীক্ষা ছাড়াই কাজ করতে পারেন নিম্নোক্ত আইনি সুরক্ষায়:
সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ
UDHR ও ICCPR-এর অনুচ্ছেদ ১৯
তথ্য অধিকার আইন ২০০৯
কার্যকর বিকল্প:
সাংবাদিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে স্ব-নিয়ন্ত্রণ
প্রেস কাউন্সিলকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করা
স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকিং ব্যবস্থা
সাংবাদিক নিবন্ধন বা বার কাউন্সিলের মতো পরীক্ষা চালু করা মানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে চিরতরে হত্যা করা। এটি গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভকে সরকারের অধীনস্থ করে দেবে। সংবিধান, আন্তর্জাতিক আইন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের আলোকে এই ধরনের সকল প্রচেষ্টাকে নীতিগতভাবে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। মুক্ত গণমাধ্যম না থাকলে সত্যিকারের গণতন্ত্র টিকবে না। সাংবাদিক সমাজসহ সকল নাগরিককে এখনই সোচ্চার হতে হবে।