পবিত্র রমজান মাসে আমাদের দেশে খাবারের আয়োজনে এক ধরনের উৎসবের আমেজ থাকে। তবে বর্তমান বাজারের ঊর্ধ্বগতি এবং প্রচণ্ড গরমের কথা মাথায় রেখে এবার গৃহিণীরা রান্নার ধরনে আনছেন বড় পরিবর্তন। ভাজাপোড়া আর অতিরিক্ত মসলাদার খাবারের বদলে গুরুত্ব পাচ্ছে সহজপাচ্য, পুষ্টিকর এবং বাজেট-ফ্রেন্ডলি ঘরোয়া খাবার। আজকের প্রতিবেদনে থাকছে অল্প সময়ে ও কম খরচে পুষ্টিকর ইফতার ও সেহরির কিছু কার্যকর টিপস ও রেসিপি।
সাশ্রয়ী ও স্বাস্থ্যকর ইফতারের কৌশল
বাজারে প্রতিটি পণ্যের দাম চড়া হওয়ায় এবারের ইফতারে মিতব্যয়িতা জরুরি। বাইরের খোলা খাবার বা রেস্তোরাঁর ইফতারি পরিহার করে বাড়িতেই তৈরি করা যেতে পারে সুস্বাদু সব পদ। পুষ্টিবিদদের মতে, ইফতারে প্রোটিন এবং ফাইবার বা আঁশজাতীয় খাবারের আধিক্য থাকা প্রয়োজন।
চিনির সরবতের বদলে এখন অনেকে তোকমা দানা, ইসবগুলের ভুষি বা লেবুর শরবতের দিকে ঝুঁকছেন। এছাড়া ছোলার সাথে প্রচুর পরিমাণে শসা, টমেটো ও কাঁচামরিচ মিশিয়ে সালাদ হিসেবে খাওয়াটা স্বাস্থ্যের জন্য বেশি উপকারি। এতে তেলের ব্যবহার যেমন কমে, তেমনি হজমেও সুবিধা হয়।
বিশেষ রেসিপি: সবজি ও ডিমের পুষ্টিকর ‘হেলদি কাটলেট’
অনেকে ইফতারে চপ বা কাটলেট খেতে পছন্দ করেন। আলু আর বেসনের আধিক্য কমিয়ে সবজি দিয়ে তৈরি করতে পারেন এই পদটি।
উপকরণ: পেঁপে, গাজর ও আলু গ্রেট করা (২ কাপ), সেদ্ধ ডিম ১টি, কাঁচামরিচ কুচি, ধনেপাতা, সামান্য চালের গুঁড়া (মুচমুচে করার জন্য) এবং লবণ।
প্রস্তুত প্রণালী: প্রথমে সবজিগুলো হালকা ভাপ দিয়ে জল ঝরিয়ে নিন। এরপর সেদ্ধ ডিমটি গ্রেট করে সবজির সাথে মেশান। এতে চালের গুঁড়া ও মসলা দিয়ে ছোট ছোট গোল আকার দিন। ডুবো তেলে না ভেজে সামান্য তেলে এপিঠ-ওপিঠ লাল করে ভেজে নিন। এটি বিকেলের নাস্তা বা ইফতারের জন্য যেমন সাশ্রয়ী, তেমনি শিশুদের জন্য অত্যন্ত পুষ্টিকর।
সেহরিতে পানিশূন্যতা রোধে বিশেষ খাবার
সারাদিন তৃষ্ণা থেকে বাঁচতে সেহরির রান্নায় বিশেষ নজর দিতে হবে। অতিরিক্ত ঝাল ও লবণাক্ত খাবার সেহরিতে বর্জন করা উচিত। কারণ লবণ শরীর থেকে পানি শুষে নেয়, ফলে রোজা রাখা অবস্থায় খুব দ্রুত তৃষ্ণা পায়।
সেহরির জন্য ‘লাউ-চিংড়ি’ বা ‘পেঁপে দিয়ে মাছের পাতলা ঝোল’ হতে পারে আদর্শ খাবার। লাউ এবং পেঁপে দুটোই শরীর ঠান্ডা রাখে এবং হজমে সহায়তা করে। এছাড়া সেহরির শেষে এক বাটি দুধ-ভাত বা দই-চিড়া খেলে দীর্ঘক্ষণ ক্ষুধা লাগে না এবং শরীর হাইড্রেটেড থাকে।
রান্নাঘর সামলানোর স্মার্ট টিপস:
১. পিয়াজু ও বেগুনির বিকল্প: বেগুনি না করে বেগুনের ভর্তা বা হালকা তেলে ভাজা বেগুন খেতে পারেন। পিয়াজুর বদলে ডাল সেদ্ধ করে তার সাথে পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে মাখিয়ে খাওয়া বেশি স্বাস্থ্যকর।
২. তেল সাশ্রয়: নন-স্টিক প্যান ব্যবহার করলে রান্নায় তেলের খরচ অর্ধেক কমিয়ে আনা সম্ভব।
৩. আগে থেকে প্রস্তুতি: রমজানে ইবাদতের সময় বের করতে আদা-রসুন বাটা বা পেঁয়াজ কুচি আগে থেকেই ফ্রিজে সংরক্ষণ করুন। এতে রান্নার সময় বাঁচে।
৪. ফলের ব্যবহার: মৌসুমি ফল যেমন তরমুজ, পেয়ারা বা পেঁপে পাতে রাখুন। এটি ভিটামিনের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি শরীরে পানিশূন্যতা রোধ করবে।
রমজান মানে কেবল রসনা বিলাস নয়, এটি সংযমের মাস। খাবারের অপচয় রোধ করে এবং পরিমিত পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে আমরা সুস্থভাবে পুরো মাস রোজা পালন করতে পারি। সঠিক খাদ্যাভ্যাসই হতে পারে এই গরমে রমজানের ক্লান্তি দূর করার প্রধান হাতিয়ার।