মোগল আমলে পারস্য এবং আফগান বণিক ও সৈন্যদের মাধ্যমে এ খাবারটি ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করে। হায়দরাবাদের নিজামদের পৃষ্ঠপোষকতায় স্থানীয় মসলা ও ডালের সংমিশ্রণে এটি আধুনিক ‘হালিম’ হিসেবে পূর্ণতা পায়।
আর রমজান মাস এলেই ইফতারের টেবিলে যে খাবারটির কথা সবার আগে মনে পড়ে, তা হচ্ছে— হালিম। গম, ডাল, মাংস ও মসলার ধীর রান্নায় তৈরি এই ঘন এবং পুষ্টিকর খাবার শুধু স্বাদের জন্য নয়, বরং ঐতিহ্য ও ইতিহাসের কারণেও বিশেষ মর্যাদায় স্থান পেয়েছে। সেই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য থেকে দক্ষিণ এশিয়া হয়ে বাংলাদেশের রান্নাঘরে জায়গা করে নেওয়া হালিম আজ এক সাংস্কৃতিক খাবারেও পরিণত হয়েছে।
হালিমের দীর্ঘ পথচলা
আগেই বলেছি— হালিমের মূল শেকড় মধ্যপ্রাচ্যে। ইতিহাসবিদরা বলছেন, আরব অঞ্চলে ‘হরিশা’ নামে একটি খাবার ছিল, যেখানে গম ও মাংস দীর্ঘ সময় ধরে রান্না করে ঘন করা হতো। পরে পারস্যে সেই খাবারের রূপান্তর ঘটে এবং মসলার ব্যবহার বাড়ে। মোগলদের হাত ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে আসার পর হালিম আরও সমৃদ্ধ হয়। যোগ হয় নানা ডাল, ঘি ও সুগন্ধি মসলার।
হায়দরাবাদে হালিম বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। নিজামদের পৃষ্ঠপোষকতায় স্থানীয় মসলা ও ডালের সংমিশ্রণে রমজানের প্রধান খাবার হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশেও হালিম ইফতারের অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে পুরান ঢাকার ইফতার সংস্কৃতিতে এর আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়েছে। আর শক্তির ভাণ্ডার হচ্ছে হালিম। গম ও ডাল থেকে পাওয়া যায় জটিল কার্বোহাইড্রেট ও ফাইবার, আর মাংস দেয় উচ্চমানের প্রোটিন। দীর্ঘ সময় রান্নার ফলে উপাদানগুলো সহজপাচ্য হয় এবং রোজাভাঙার পর শরীরে দ্রুত শক্তি জোগায়। এ ছাড়া এতে আয়রন, জিংক ও ভিটামিন বি-কমপ্লেক্সও পাওয়া যায়।
হালিম শুধু খাবার নয়, বরং রমজানের সামাজিকতা ও ঐতিহ্যের একটি অংশ। পরিবারের সবাই মিলে ভাগাভাগি করে খাওয়া কিংবা প্রতিবেশীর সঙ্গে বিনিময়ের মাধ্যমে এ খাবার এক ধরনের সামাজিক বন্ধনও তৈরি করে। সব মিলিয়ে এককথায় বলা যায়, ইতিহাসের দীর্ঘপথ পেরিয়ে হালিম আজ রমজানের অন্যতম প্রতীকী খাবার হয়ে উঠে এসেছে। পুষ্টিগুণ, স্বাদ ও ঐতিহ্যের সমন্বয়ে ইফতারের টেবিলে এর জনপ্রিয়তা ভবিষ্যতেও অটুট থাকবে।
হালিমের রেসিপি
ঘরেই সহজে সুস্বাদু হালিম তৈরি করা যায়। সে জন্য প্রয়োজন বিভিন্ন ডাল (মসুর, মুগ, ছোলা), সুগন্ধি চাল, মাংস (গরু কিংবা খাসি), পেঁয়াজ, আদা-রসুন বাটা, মরিচ, গরম মসলা, হলুদ, জিরা, ধনে গুঁড়া, ঘি ও লবণ। প্রথমে চাল ও ডাল কয়েক ঘণ্টা ভিজিয়ে নরম করে নিতে হবে। এরপর এগুলো সিদ্ধ করে ব্লেন্ড বা বেটে ঘন মিশ্রণ তৈরি করতে হবে। অন্যদিকে মাংস মসলা দিয়ে ভালোভাবে রান্না করে নরম করে নিতে হবে। তারপর গম-ডালের মিশ্রণ ও মাংস একসঙ্গে দিয়ে ধীরে আঁচে দীর্ঘ সময় নেড়ে রান্না করতে হবে, যাতে সব উপাদান মিশে ঘন ও মোলায়েম টেক্সচার তৈরি হয়। শেষে ঘি, ভাজা পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, ধনেপাতা ও লেবুর রস দিয়ে পরিবেশন করলে হালিমের স্বাদ আরও বাড়ে।