প্রতিদিনের খাবারের প্লেটটি আসলে কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। বছরের পর বছর আমাদের অনেকের ধারণা, প্লেটের মাঝখানে বড় এক টুকরো মাংসই হবে মূল খাবার, আর পাশে থাকা সালাদ বা সবজি শুধু বাড়তি কিছু। তবে হার্ভার্ড হেলথ বলছে, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হলে খাবারের প্লেট সম্পর্কে এই ধারণাটিই বদলানো জরুরি।
হার্ভার্ডের ‘হেলদি ইটিং প্লেট’ নির্দেশনা অনুযায়ী, একটি স্বাস্থ্যকর খাবারের প্লেটের প্রায় অর্ধেকজুড়ে থাকা উচিত ফল ও সবজি। এক-চতুর্থাংশে থাকবে পূর্ণ শস্য এবং বাকি এক-চতুর্থাংশে স্বাস্থ্যকর প্রোটিন। এই অনুপাত নির্দিষ্ট ক্যালরি বা পরিমাণের নির্দেশনা নয়; বরং প্রতিটি খাবারে বিভিন্ন খাদ্যগোষ্ঠীর আনুমানিক ভারসাম্য বোঝানোর একটি সহজ পদ্ধতি।
প্লেটের অর্ধেক ফল ও সবজি
খাবারের প্লেটের অর্ধেক অংশে বিভিন্ন ধরনের ফল ও সবজি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যত বেশি রং ও বৈচিত্র্য রাখা যায়, তত ভালো। তবে আলু ও ফ্রেঞ্চ ফ্রাইকে এই হিসাবের সবজি হিসেবে ধরা হয় না।
এক-চতুর্থাংশ পূর্ণ শস্য
প্লেটের এক-চতুর্থাংশ অংশে রাখা যেতে পারে পূর্ণ বা অক্ষত শস্য। বার্লি, কুইনোয়া, ওটস, ব্রাউন রাইস ও পূর্ণ শস্য থেকে তৈরি খাবার ভালো বিকল্প। এসব শস্য পরিশোধিত শস্যের তুলনায় রক্তে শর্করা ও ইনসুলিনের ওপর তুলনামূলক মৃদু প্রভাব ফেলে।
বাকি এক-চতুর্থাংশ প্রোটিন
প্লেটের বাকি এক-চতুর্থাংশ পূরণ করা যেতে পারে মাছ, মুরগি, ডিম, বিনস, বাদাম ও বীজের মতো স্বাস্থ্যকর প্রোটিন দিয়ে। অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত মাংস ও প্রক্রিয়াজাত মাংস এড়িয়ে চলা এবং লাল মাংস সীমিত রাখার পরামর্শ দিয়েছে হার্ভার্ড।
রান্নায় স্বাস্থ্যকর তেল
রান্না, সালাদ কিংবা খাবারের সঙ্গে অলিভ অয়েল ও ক্যানোলা অয়েলের মতো স্বাস্থ্যকর উদ্ভিজ্জ তেল ব্যবহার করা যেতে পারে। অন্যদিকে মাখনের ব্যবহার সীমিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পানীয়ের ক্ষেত্রেও সচেতনতা
পানীয় হিসেবে পানি সবচেয়ে ভালো পছন্দ। চিনি কম বা না থাকা কফি ও চাও বেছে নেওয়া যেতে পারে। চিনিযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলা এবং দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার দিনে এক থেকে দুই সার্ভিংয়ের মধ্যে সীমিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যকর খাবারের জন্য আগে থেকেই পরিকল্পনা
স্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস ধরে রাখতে শুধু খাবারের তালিকা জানলেই হয় না; প্রয়োজন পরিকল্পনাও। কর্মব্যস্ত দিনের শেষে ঘরে স্বাস্থ্যকর উপকরণ না থাকলে সহজেই বাইরে থেকে অস্বাস্থ্যকর খাবার অর্ডার করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। তাই সপ্তাহের শুরুতেই মোটামুটি খাবারের পরিকল্পনা করে নেওয়া ভালো। হার্ভার্ড হেলথও খাবারের পরিকল্পনা, বাজারের তালিকা তৈরি এবং আগেভাগে কিছু খাবার প্রস্তুত করে রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
বাজারে যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় খাবারের তালিকা করে নেওয়া যেতে পারে। তাজা ফল ও সবজির পাশাপাশি ঘরে পূর্ণ শস্য, ডিম, বিনস, ডাল কিংবা হিমায়িত সবজির মতো সহজে সংরক্ষণযোগ্য উপকরণ রাখা যেতে পারে। এতে ব্যস্ত দিনেও দ্রুত স্বাস্থ্যকর খাবার তৈরি করা সহজ হয়।
যেসব খাবার দ্রুত নষ্ট হয়, সেগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী কেনাই ভালো। এতে খাবার ও অর্থের অপচয় কমবে। প্যাকেটজাত খাবার কেনার সময় লেবেল দেখে অতিরিক্ত সোডিয়াম, বাড়তি চিনি ও বেশি স্যাচুরেটেড ফ্যাট রয়েছে কি না, সেদিকেও নজর দেওয়া উচিত।
আগের রাতেই পরদিনের খাবারের কিছু প্রস্তুতি নিয়ে রাখা যেতে পারে। যেমন—হিমায়িত মাছ নিরাপদভাবে গলিয়ে রাখা, ডাল বা বিনস ভিজিয়ে রাখা কিংবা সবজি কেটে সংরক্ষণ করা। এতে রান্নার সময়ও কমে যায়।
রান্নার পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ
স্বাস্থ্যকর খাবারের পাশাপাশি রান্নার পদ্ধতির দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। ডুবো তেলে ভাজার বদলে অল্প পরিমাণ স্বাস্থ্যকর তেলে হালকা ভাজা, রোস্ট, বেক, পোচ বা অল্প আঁচে রান্নার মতো পদ্ধতি বেছে নেওয়া যেতে পারে।
খাবারের ডায়েরি রাখতে পারেন
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ধরে রাখতে খাবারের ডায়েরি রাখাও উপকারী হতে পারে। কী খাচ্ছেন, কতবার খাচ্ছেন এবং কোন ধরনের খাবার বেশি খাওয়া হচ্ছে এসব লিখে রাখলে নিজের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে সচেতন হওয়া সহজ হয়। হার্ভার্ড হেলথের মতে, খাদ্য ডায়েরি নিজের খাদ্যাভ্যাসের দুর্বল দিক চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত স্বাস্থ্য লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা করতে পারে।
সবশেষে, স্বাস্থ্যকর খাবারের অর্থ কোনো একটি খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়া নয়। বরং প্রতিদিনের প্লেটে ফল, সবজি, পূর্ণ শস্য ও স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের ভারসাম্য তৈরি করা, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার ও চিনিযুক্ত পানীয় কমানো এবং নিয়মিত পরিকল্পনার মাধ্যমে একটি টেকসই খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলাই মূল লক্ষ্য। ব্যক্তিভেদে বয়স, শারীরিক অবস্থা ও পুষ্টির প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে তাই বিশেষ কোনো রোগ বা খাদ্যসংক্রান্ত প্রয়োজন থাকলে পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।