দিন দিন রাজধানীর সড়কে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। ভিআইপি সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি বিভিন্ন এলাকায় এসব যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল নিয়ে অভিযোগ বাড়ছে। ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য, উল্টো পথে চলাচল, অতিরিক্ত গতি এবং ব্যস্ত সড়কে যাত্রী ওঠানামার কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ও যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়রা।
নগরবাসীর অভিযোগ, অনেক ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকের নির্ধারিত লাইসেন্স নেই, যানবাহনের নিবন্ধন বা নম্বরও নেই। ফলে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে চালক ও যানবাহন শনাক্ত করা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল বন্ধে দ্রুত কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দাবি উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীতে তুলনামূলক নিরাপদ ও স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত ই-রিকশা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আফতাবনগর ও জিগাতলা এলাকায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) স্বীকৃত তিন চাকার ই-রিকশার পরীক্ষামূলক চলাচল শুরু হয়। এসব যানবাহনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট এলাকা, লাইসেন্সধারী চালক, গতিসীমা ও অন্যান্য নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছিল।
তবে বর্তমানে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যে বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলছে, সেগুলোর বড় একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ ও নিবন্ধন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব যানবাহনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
বৃহত্তর মিরপুরের এলাকায় গড়ে উঠেছে এক বিশাল সিন্ডিকেট এবং অটোরিকশা চার্জের এক রমরমা ব্যবসা। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিছু অটোরিকশা ট্রাফিক সিগন্যাল উপেক্ষা করে এবং উল্টো পথে চলাচল করে। অনেক সময় দ্রুতগতিতে ওভারটেক করতেও দেখা যায়। ব্যস্ত সড়কে হঠাৎ থেমে যাত্রী ওঠানামার কারণে যানজটও তীব্র হচ্ছে।
মোটরবাইক চালক গণমাধ্যম কর্মী তারেক আজিজ নিশোক বলেন, ‘অটোরিকশা চালকদের অনেকের লাইসেন্স নেই, গাড়িরও নির্দিষ্ট নম্বর নেই। অথচ তারা রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে চলাচল করছে। তাদের একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় আনা জরুরি।’
ভুক্তভোগী পথচারী ও একজন সাংবাদিক মোহাম্মদ মাহবুব উদ্দিন বলেন, ‘প্রতিদিন রাস্তা পার হতে ভয় লাগে। কখন কোন দিক থেকে দ্রুতগতির অটোরিকশা এসে ধাক্কা দেবে, বলা যায় না। কিছুদিন আগে আফতাবনগরে একটি অটোরিকশার সঙ্গে আমার গাড়ির সংঘর্ষও হয়েছে।’
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টদের মতে, অপ্রাপ্তবয়স্ক বা প্রশিক্ষণহীন চালকদের হাতে এসব যানবাহন থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়ে। তাই চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সের পাশাপাশি যানবাহনের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
এদিকে বুয়েট উদ্ভাবিত ই-রিকশার ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালে বুয়েটের তৈরি বিকল্প অটোরিকশার মডেলে তিন চাকায় হাইড্রোলিক ডিস্ক ব্রেক ও পার্কিং ব্রেক ব্যবহারের কথা জানানো হয়েছিল।
অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সরকারি পর্যায়েও আলোচনা চলছে। চলতি বছরের শুরুতে সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেছিলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা পুরোপুরি তুলে দেওয়ার পরিবর্তে শৃঙ্খলার আওতায় আনা প্রয়োজন। চালকদের জীবিকা ও পরিবারের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখার কথা তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের বক্তব্য অনুযায়ী, যানজট ও সড়কে বিশৃঙ্খলা কমাতে প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পর্যায়ক্রমে অটোরিকশার প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে চালকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
নগরবাসীর দাবি, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ না করে একটি সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত কাঠামোর মধ্যে আনা যেতে পারে। এর আওতায় যানবাহনের নিবন্ধন, চালকদের লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণ, নির্দিষ্ট রুট ও গতিসীমা, যানবাহনের নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সড়কের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় অটোরিকশার সংখ্যা নির্ধারণ এবং প্রধান সড়কে চলাচলের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে দুর্ঘটনা ও যানজট কমানোর পাশাপাশি চালকদের জীবিকাও একটি নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে রাখা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজধানীর সড়কে অটোরিকশার প্রয়োজনীয়তা ও চালকদের জীবিকার বিষয়টি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি যাত্রী ও পথচারীদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা জরুরি। তাই দ্রুত একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়নের দিকেই এখন নজর নগরবাসীর।