দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে দেশে ফিরেই এক আবেগঘন মুহূর্তের অবতারণা করলেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর ৩০০ ফিট এলাকায় আয়োজিত এক বিশাল গণসংবর্ধনায় দেশবাসীর উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার পর তিনি সরাসরি ছুটে যান বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তাঁর মা এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর মা ও ছেলের এই সাক্ষাৎকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে এক অন্যরকম আবেগ।
হাসপাতালে পৌঁছানোর মুহূর্ত
পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে তারেক রহমান এভারকেয়ার হাসপাতালে পৌঁছান। এর আগে থেকেই হাসপাতালের প্রবেশপথ ও আশপাশের এলাকায় দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নেতাকে একনজর দেখার জন্য হাজার হাজার মানুষ সেখানে অবস্থান নেন। কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তিনি হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ করেন এবং সরাসরি তাঁর মায়ের কেবিনে চলে যান। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, মায়ের শয্যাপাশে বসে তিনি বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটান এবং চিকিৎসকদের কাছ থেকে তাঁর শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন।
আবেগাপ্লুত নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ভিড়
তারেক রহমানের আগমনের খবর ছড়িয়ে পড়লে বসুন্ধরা ও তৎসংলগ্ন এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। বিশেষ করে যারা ৩০০ ফিটের গণসংবর্ধনা মঞ্চের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেননি, তারা সরাসরি হাসপাতালের সামনে এসে ভিড় জমান। দীর্ঘ ১৭ বছর পর প্রিয় নেতাকে সামনে পেয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি অনেক কর্মী। তাদের মুহুর্মুহু স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো হাসপাতাল এলাকা। নেতাকর্মীদের ভাষ্য, এই দিনটির জন্য তারা দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করেছেন। মায়ের জন্য ছেলের এই ব্যাকুলতা সাধারণ মানুষের মনেও গভীর রেখাপাত করেছে।
১৭ বছর পর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন
এর আগে, আজ বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে তারেক রহমানকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার (ফ্লাইট নং বিজি-২০২) হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে দেশের মাটিতে পা রাখতেই তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে বিমানবন্দরে জড়ো হন দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দসহ লাখো জনতা। বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
৩০০ ফিটের ঐতিহাসিক জনসভা
বিমানবন্দর থেকে তারেক রহমান সরাসরি যোগ দেন রাজধানীর ৩০০ ফিট এলাকায় আয়োজিত এক বিশাল গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে। সেখানে অস্থায়ী মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি উপস্থিত জনতা ও দেশবাসীর উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন। বক্তব্যে তিনি দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার লড়াইয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি দেশবাসীর কাছে তাঁর অসুস্থ মায়ের জন্য দোয়া প্রার্থনা করেন এবং জনসভা শেষ করেই হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা দেন।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করল। দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফিরে সরাসরি অসুস্থ মায়ের পাশে যাওয়ার এই সিদ্ধান্তটি কেবল পারিবারিক দায়িত্ববোধ নয়, বরং দেশজুড়ে থাকা তাঁর সমর্থকদের মাঝে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।
এভারকেয়ার হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল থাকলেও তিনি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। মায়ের পাশে ছেলের এই অবস্থান এবং নেতাকর্মীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আগামীর রাজনীতিতে বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
রাত পর্যন্ত তারেক রহমান হাসপাতালেই অবস্থান করছিলেন এবং বাইরে তখনও হাজারো নেতাকর্মী তাদের নেতার এক পলক দেখার অপেক্ষায় প্রহর গুনছিলেন।