শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬, ১২:৪৭ পূর্বাহ্ন

ঋণখেলাপি বিতর্কে উত্তপ্ত সংসদ

আওয়াজ অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেটের সময় : বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬
  • ১ টাইম ভিউ
ঋণখেলাপি বিতর্কে উত্তপ্ত সংসদ

বাজেট আলোচনায় ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ এবং সংসদ সদস্যদের ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে স্বতন্ত্র সদস্য রুমিন ফারহানার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে বিতর্ক হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের এই সদস্যের বক্তব্যকে ‘মানহানিকর’ হিসেবে বর্ণনা করে তা জাতীয় সংসদের কার্যবিবরণীতে বাদ দেওয়ার দাবি জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও সরকারি দলের সদস্য ফজলুল হক মিলন। অধিবেশনের সভাপতি ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে বলেন, বক্তব্যটি পর্যালোচনা করে পরে স্পিকারের আসন থেকে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

বৃহস্পতিবার নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বতন্ত্র সদস্য রুমিন ব্যাংক খাতের মন্দ ঋণ, পুনঃতফসিল করা ঋণ এবং সংসদ সদস্যদের কাছে ব্যাংকের পাওনার প্রসঙ্গ তোলেন। তার বক্তব্যের পর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে গাজীপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য ফজলুল হক মিলন আপত্তি জানান।

পরে এ বিষয়ে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির নাহিদ ইসলাম।

মন্দ ঋণ নিয়ে কী বলেছেন রুমিন?

বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য রুমিন বলেন, ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনার মধ্যেই ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে রয়েছে। তিনি বলেন, “ঋণখেলাপিদের এই সংসদে দাঁড়িয়ে বলতে হচ্ছে, বাংলাদেশের মোট মন্দ ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা।

“এর সঙ্গে যদি আপনি অবলোপন, পুনঃতফসিল করা ও মামলার কারণে যে ঋণের টাকা আটকে আছে আদালতে অর্থাৎ পেন্ডি মামলা হিসেবে যেটা এখনো খাতায় তোলা হয়নি অ্যামাউন্টটা, সেটা যদি আমরা যোগ করি, এই পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে ১১ লাখ কোটি টাকা, যেটা মোট ঋণের ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ।”

সুতরাং ব্যাংক চাইলেও সরকারকে বেশি সহায়তা দিতে পারবে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, এই বাইরে থাকছে টাকা ছাপানো বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া। এই টাকা বাজারে মূল্যস্ফীতি উসকে দেয়।

এর পর রুমিন ফারহানা বৈদেশিক ঋণের হিসাব তুলে ধরেন। অধিবেশন শেষ হওয়ার আগে আবার ফ্লোর নিয়ে স্বতন্ত্র এই সদস্য বলেন, “টিআইবি সম্প্রতি বলছে যে এই সংসদের সদস্যদের কাছে এই দেশের ব্যাংকগুলোর পাওনা হচ্ছে ১১ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা।”

তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে কীভাবে ঋণ পুনঃতফসিল করা হয় এবং সিআইবিতে (বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো) নাম আসার পর কীভাবে আদালতে গিয়ে তা স্থগিত রেখে নির্বাচনে অংশ নেওয়া হয়, আইনজীবী হিসেবে তা তিনি জানেন।

‘ঋণখেলাপিদের সংসদ বলা যায় না’

রুমিন ফারহানার বক্তব্যের পর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে ফজলুল হক মিলন বলেন, ‘ঋণখেলাপিদের সংসদ’ ধরনের মন্তব্য সংসদের মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি বলেন, “ঋণখেলাপি সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেন না। সেখানে ঋণখেলাপিদের সংসদ কী করে হয়?”

বক্তব্যটি কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে সরকারি দলের সদস্য মিলন বলেন, নিজেদের মর্যাদাহানি হয়— এমন কথা সংসদে না বলার বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকা উচিত।

এ সময় অধিবেশনের সভাপতি ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, বক্তব্যটি পরীক্ষা করে দেখা হবে। তিনি বলেন, “যদি আপনারও বক্তব্যে সেটা প্রতিফলিত হয়ে থাকে, সেই অংশটা আমরা বিচার-বিশ্লেষণ করে ‘এক্সপাঞ্জ’ হওয়ার মতো হলে ‘এক্সপাঞ্জ’ করব।”

নাহিদ ইসলাম

‘তাহলে আর কোথায় বলব’

এরপর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, নির্বাচনের আগে ও পরে ঋণখেলাপিদের বিষয়ে সংসদে আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা নির্বাচনের আগেও ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কথা বলেছি। ঋণখেলাপিদের নমিনেশন দেওয়া হয়েছে।”

নাহিদ বলেন, “এখন যদি সংসদে এতগুলো ঋণখেলাপি থাকে, তাহলে এই সংসদকে তো ঋণখেলাপীদের সংসদ বলবে বা সরকারদলীয় লোকেরা যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ, তারা ঋণখেলাপিদের সংসদে নিয়ে এসেছে—এটা সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বলবে।”

তিনি বলেন, “এই সংসদে যদি আমরা ঋণখেলাপিদের ঋণখেলাপি বলতে না পারি, তাহলে আর কোথায় বলব?”

তার মতে, এ ধরনের বক্তব্য কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার মতো নয়।

সালাহউদ্দিন আহমদ

‘এখানে কেউ ঋণখেলাপি না’

এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জাতীয় সংসদ এবং সংসদ সদস্যদের সম্মান রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। তিনি বলেন, “এখানে যারা আছেন, কেউ ঋণখেলাপি না। ‘রিপ্রেজেন্টেশন অব পিপল অর্ডার’ এবং অন্যান্য বিধিমালা অনুসারে যারা ঋণখেলাপি, তারা ‘ডিসকোয়ালিফাইড’। তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারে না।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কারও বিরুদ্ধে ব্যাংক বা অন্য পক্ষের মামলা থাকতে পারে, কিন্তু আদালতের প্রক্রিয়া শেষে বৈধ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হলে তাকে ঋণখেলাপি বলা যায় না। তিনি বলেন, “ঋণগ্রস্ত হতে পারে, ঋণখেলাপি না। এখন যদি কেউ দাবি করেন যে এই সংসদে ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, এটা কোনো ‘লিগ্যাল ইন্টারপ্রিটেশনে’ ঠিক না।”

এ ধরনের বক্তব্যকে ‘ডিফেমেটরি স্টেটমেন্ট’ আখ্যা দিয়ে তিনি তা কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার অনুরোধ জানান। ফজলুল হক মিলন, নাহিদ ইসলাম ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যের পর আবার দাঁড়িয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, নির্বাচনের আগেও তিনি ঋণখেলাপিদের বিষয়ে কথা বলেছেন এবং সংসদের প্রথম অধিবেশনেও কিছু সদস্যের ঋণের তথ্য তুলে ধরেছিলেন।

এরপর ডেপুটি স্পিকার অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো খবর